২০০৯ সালের কথা। ইতালির ত্রিয়েস্তে শহরের এক রাস্তায় এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করার অপরাধে আবদেল মালেক বাউতকে নয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সেই মামলার শুনানিতে তার আইনজীবী এমন এক যুক্তি হাজির করলেন যা আইনি এবং বৈজ্ঞানিক মহলে হইচই ফেলে দিয়েছিল। আইনজীবীর দাবি ছিল বাউতের ডিএনএ-তে এমন এক বিশেষ পরিবর্তন বা মিউটেশন রয়েছে যা তাকে প্রাকৃতিকভাবেই আক্রমণাত্মক করে তোলে। এই বিশেষ জিনটি ‘ওয়ারিয়র জিন’ বা যোদ্ধার জিন নামে পরিচিত। আশ্চর্যজনকভাবে আদালত সেই যুক্তি মেনে নিয়ে বাউতের সাজা এক বছর কমিয়ে দেয়। এই ঘটনাটি আমাদের এক গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়: মানুষ কি তবে তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী নয়? আমাদের ব্যক্তিত্ব কি তবে জন্মের সময়ই জিনের মাধ্যমে ঠিক হয়ে যায়?
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি ধারণা বেশ প্রবল ছিল যে এমএওএ নামক একটি জিনের পরিবর্তনের সাথে মানুষের সহিংস আচরণের যোগসূত্র রয়েছে। সেই ধারণা থেকেই ২০০৪ সালে গণমাধ্যমে এই বিষয়টিকে ‘ওয়ারিয়র জিন’ হিসেবে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। তবে আধুনিক বিজ্ঞান এখন বলছে যে বিষয়টি এতোটাও সরল নয়। আমস্টারডাম ইউএমসি-র অধ্যাপক আয়সু ওকবে বলছেন যে একটি মাত্র জিন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে এমন ধারণা এখন পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেছে। আসলে উচ্চতা বা বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলোও জিনের ওপর যতটা নির্ভরশীল বলে আমরা এক সময় ভাবতাম, বর্তমান গবেষণায় দেখা যাচ্ছে তার পেছনে রয়েছে কয়েক হাজার জিনের অতি ক্ষুদ্র প্রভাবের সমষ্টি।
মানুষের ব্যক্তিত্বকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৮৭৫ সালে যখন ফ্রান্সিস গালটন ‘নেচার ভার্সেস নার্চার’ বা প্রকৃতি বনাম লালন-পালনের বিতর্কটি জনপ্রিয় করেছিলেন। তখন থেকেই যমজ সন্তানদের ওপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন যে কার আচরণের কতটুকু জিনের দান। ১৯২০ সালের পর থেকে এক অভিন্ন ডিএনএ সম্পন্ন যমজদের সাথে আলাদা ডিএনএ সম্পন্ন যমজদের তুলনা করার পদ্ধতি শুরু হয়। এই গবেষণাগুলো থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে যে মানুষের ব্যক্তিত্ব মূলত পাঁচটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে—মুক্তমনা হওয়া, বিবেকবুদ্ধি, বহির্মুখিতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং স্নায়বিক অস্থিরতা। একে সংক্ষেপে ‘বিগ ফাইভ’ বলা হয়।
দীর্ঘ ৬০ বছরের প্রায় আড়াই হাজার গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রায় ৪৭ শতাংশ জিনের মাধ্যমে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়। আর বাকি ৫৩ শতাংশ নির্ধারিত হয় তার পরিবেশ ও জীবন যাপনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। ১৯৭৯ সালের এক বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গিয়েছিল জিম নামধারী দুই যমজ ভাই যারা জন্মের পরপরই আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন, ৩৯ বছর পর যখন তাদের দেখা হয় তখন দেখা যায় তাদের অনেক অদ্ভুত মিল। এমনকি তাদের পোষা কুকুরের নাম থেকে শুরু করে তাদের স্ত্রীর নাম পর্যন্ত এক ছিল। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন এই ধরনের মিলগুলো নেহাতই কাকতালীয় হতে পারে কারণ লক্ষ লক্ষ তথ্যের মধ্যে কিছু মিল পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
বর্তমানে বিজ্ঞানীদের কাছে মানুষের জিনোমের ৩ বিলিয়ন ‘বেস পেয়ার’ নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। আমরা জানি যে সকল মানুষের ডিএনএ ৯৯.৯ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিন্ন। বাকি মাত্র ০.১ শতাংশ আমাদের একে অপরের থেকে আলাদা করে তোলে। কিন্তু এই সামান্য অংশের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বৈচিত্র্য। সাম্প্রতিক ‘জিনোম-ওয়াইড অ্যাসোসিয়েশন স্টাডিজ’ থেকে দেখা যাচ্ছে যে মানুষের ব্যক্তিত্বের সাথে জিনের সম্পর্ক আগে যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক কম। আগে ধারণা করা হতো ৪৭ শতাংশ প্রভাব জিনের, কিন্তু সরাসরি ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে এর প্রভাব মাত্র ৯ থেকে ১৮ শতাংশ। একে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘মিসিং হেরিটেবিলিটি’ বা হারানো বংশগতি সমস্যা।
এখানেই আসল রহস্য লুকিয়ে আছে। ব্যক্তিত্ব আসলে কোনো স্থির বিষয় নয়। শৈশবে কেউ অনেক বেশি অস্থির থাকলেও পরিণত বয়সে সে অনেক বেশি ধীরস্থির হয়ে উঠতে পারে। পরিবেশের প্রভাবে আমাদের জিনগুলোও ভিন্নভাবে সাড়া দিতে পারে। তাই আপনার জন্মগত ডিএনএ আপনাকে একটি ছাঁচ দিতে পারে কিন্তু আপনি সেই ছাঁচে নিজেকে কীভাবে গড়বেন তা আপনার শিক্ষা, পরিবেশ এবং অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান আমাদের এটিই শিক্ষা দিচ্ছে যে জিনের হাতে আমরা বন্দি নই বরং আমাদের পরিবর্তনের সুযোগ সবসময়ই থাকে।
