সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

সার্বিয়ায় নির্বাচনী নাটক

ক্ষমতা হারালেন ভুচিচ: সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিজয়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৬:৩০ এএম

ক্ষমতা হারালেন ভুচিচ: সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিজয়

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাক্ষী হলো সার্বিয়া। অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক সংসদীয় নির্বাচনে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতা আলেকজান্ডার ভুচিচ রবিবার নিজের পরাজয় মেনে নিয়েছেন। এই নির্বাচনে ভুচিচ ও তার ডানপন্থী সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টি মুখোমুখি হয়েছিল একটি বৈচিত্র্যময়, ছাত্র পরিচালিত বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে, যারা গত দুই বছর ধরে সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল।

নির্বাচনের ফলাফল আসার সঙ্গে সঙ্গেই বেলগ্রেডসহ বিভিন্ন শহরের রাজপথে নেমে আসে উল্লাসিত মানুষের ঢল। বেলগ্রেডের বাসিন্দা ড্রাগানা কোভাসেভিচ জানান, রাস্তায় সবাই একে অপরকে মুচকি হেসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে এবং মানুষ এতোটাই আনন্দিত যে মনে হচ্ছে অবশেষে দেশটি একটি স্বাভাবিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

সার্বিয়ার ৬৪ লাখ ভোটার আড়াইশ সদস্যের সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার প্রায় দেড় ঘণ্টা পরই নিজের পরাজয়ের কথা ঘোষণা করেন ভুচিচ। তিনি জানান, তরুণদের সমর্থিত স্টুডেন্টস লিস্ট সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে ১৩৫ থেকে ১৪০টি নিশ্চিত করতে যাচ্ছে, আর তার দল পেতে পারে প্রায় ১০৫টি আসন।

নির্বাচনী রাতে নিজ দলের কার্যালয়ে সমবেত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ভুচিচ বলেন, এটি পরিষ্কার যে তারা হেরে গেছেন। তিনি দাবি করেন, তার দল প্রায় ১৭ লাখ ভোট পেলেও স্টুডেন্টস লিস্ট পেয়েছে প্রায় ২২ লাখ ভোট। এই পরাজয়ের জন্য তিনি স্বাধীন গণমাধ্যম, ইউরোপীয় হস্তক্ষেপ এবং আমেরিকান ডিপ স্টেটকে দায়ী করেছেন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রায় দুটি পূর্ণ মেয়াদ দায়িত্ব পালনের পর ভুচিচ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের নেতৃত্ব দিতে তিনি গত মাসে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তবে ২০২৪ সালে নোভিসাদে ঘটে যাওয়া একটি ট্র্যাজেডির পর থেকেই এই পপুলিস্ট নেতার জনপ্রিয়তায় ধস নামতে শুরু করে। ওই দুর্ঘটনায় রেল স্টেশনের কংক্রিটের ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সংস্কার কাজের সময় ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল বলে অভিযোগ তোলেন বিক্ষোভকারীরা।

নিহতদের মধ্যে একজনের মা দিয়ানা হ্রকা বেলগ্রেডে উল্লাস করার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি এনওয়ান টেলিভিশনকে জানান, তিনি বিগত দুই বছর ধরে এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিলেন এবং এখন তিনি দায়ীদের বিচার ও জবাবদিহিতা দেখতে চান।

ভুচিচের একচ্ছত্র ক্ষমতার বিপরীতে এই নেতৃত্বহীন তরুণ আন্দোলন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্টুডেন্টস লিস্টে সরাসরি কোনো শিক্ষার্থী ছিলেন না, বরং ব্যালটে রাখা হয়েছিল তুলনামূলক অপরিচিত বিশেষজ্ঞ, অ্যাথলেট, কৃষক ও শিল্পীদের। গণতন্ত্র ও অর্থনীতি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তারা একটি নির্দলীয় প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।

সার্বিয়ায় ২০০০ সালের পর এবারই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে দেখা যায় দীর্ঘ সারি। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লিয়েন ছাত্র আন্দোলনকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন যে আইনের শাসন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারে সার্বিয়াকে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

স্টুডেন্টস লিস্টের প্রার্থী রাদোমির সাইচিচ সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই ফলাফল ভয়ের বিরুদ্ধে জয় এবং একই সাথে এটি নাগরিকদের দায়িত্বশীলতার বিজয়। বেলগ্রেডের রাজপথে সমর্থকরা গাড়ি চালিয়ে হর্ন বাজাতে থাকেন এবং ভুচিচের পতন হয়েছে স্লোগান দিতে থাকেন। অন্যদিকে, ভুচিচ সমর্থকদের তাঁবু ও বেষ্টনী ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় বিজয়ী জনতা।

banner
Link copied!