বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

জলবায়ু সংকট

জলবায়ুকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হবে: ল্যানসেট সমীক্ষা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ১০:০০ এএম

জলবায়ুকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হবে: ল্যানসেট সমীক্ষা

তীব্র গরমে গত কয়েক বছরে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর জেরে জলবায়ু পরিবর্তনকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার জোরালো দাবি উঠেছে। আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনের আগে ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নতুন প্রতিবেদনে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠাতব্য কপ৩১ জলবায়ু সম্মেলনের ঠিক আগে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানবস্বাস্থ্যের ওপর পড়া নেতিবাচক প্রভাবগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য বিশ্বের ত্রিশটি দেশের ১৪৬ জন গবেষক একযোগে কাজ করেছেন। এটি ছিল এই সিরিজের দশম প্রতিবেদন, যেখানে ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এতে জানানো হয়েছে, শুধু ২০২৩ সালেই বিশ্বে একাত্তর হাজার মানুষ অতিরিক্ত গরমে মারা গেছেন। এর অর্ধেকের বেশির মৃত্যুর পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি দায়ী ছিল।

সংবাদ সম্মেলনে ল্যানসেট কাউন্টডাউন প্রকল্পের নির্বাহী পরিচালক মারিনা রোমানেল্লো জানান, ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির পর থেকে আট বছরে বিশ্বজুড়ে ত্রিশ লাখ মানুষ তাপপ্রবাহের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন।

এই মৃত্যুর সংখ্যাটি একটি পুরো অঞ্চলের জনসংখ্যার ধ্বংসের সমতুল্য। রোমানেল্লো উল্লেখ করেন, এসব মৃত্যুর আটষট্টি শতাংশই সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে।

প্যারিস চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল প্রাক শিল্প যুগের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।

মারিনা রোমানেল্লো সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেবল আপৎকালীন পদক্ষেপ না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত কৌশল গ্রহণের আহ্বান জানান। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওলি জে গবেষণার পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে বলেন, গবেষকরা বিভিন্ন দেশের নথিভুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবহীন স্বাভাবিক মৃত্যুর হার বাদ দিয়েছেন।

তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র তাপপ্রবাহের মাত্রা ও পুনরাবৃত্তি মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। গত বছর বিশ্বের অর্ধেকের বেশি স্থলভাগ অন্তত এক মাস চরম খরা ও দাবদাহের শিকার হয়েছিল।

উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বিশ্ব অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় গত তিন বছরে প্রতি বছর এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চল এই ক্ষতির মুখে সবচেয়ে বেশি পড়েছে। এই অঞ্চলগুলোতে যথাক্রমে তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ৩ দশমিক ২ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে।

তুলনামূলকভাবে ইউরোপের ক্ষতির পরিমাণ শূন্য দশমিক ২ শতাংশ এবং আমেরিকার ক্ষেত্রে তা ১ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতিও লক্ষ্য করা গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বায়ান্নটি দেশ চরম আবহাওয়া মোকাবিলায় তাদের স্বাস্থ্য ও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা উন্নত করেছে। পাশাপাশি, পরিচ্ছন্ন শক্তিতে বিনিয়োগের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

২০২৫ সালে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ দুই দশমিক এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় দ্বিগুণ। তবে বৈশ্বিক জ্বালানির আংশিক চাহিদা মেটাতেও এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ৮০ শতাংশ।

জীবাশ্ম জ্বালানির কারণে সৃষ্ট বায়ু দূষণে প্রতি বছর সাতাশ লাখ মানুষ মারা যান। তবে যেসব দেশে বায়ু দূষণ কিছুটা কমেছে, সেখানে প্রায় বত্রিশ হাজার মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে।

জলবায়ু সংক্রান্ত চিকিৎসা গবেষণার জন্য তহবিল বৃদ্ধি পেলেও বৈষম্য রয়ে গেছে। মোট তহবিলের একটি বড় অংশ ধনী দেশগুলোর গবেষকদের পেছনে ব্যয় হলেও সবচেয়ে কম উন্নত দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশের সুনির্দিষ্ট তথ্যের অনুপস্থিতি গবেষকদের কাজকে ব্যাহত করেছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জলবায়ু সংকট ও স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব অনেক সময় আড়ালে চলে যাচ্ছে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।

banner
Link copied!