রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

ইসরায়েলি আরব সংখ্যালঘু

ইসরায়েলে আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে আরব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১১:৩০ এএম

ইসরায়েলে আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে আরব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়

জীবনে কখনো ইসরায়েলি সংসদীয় নির্বাচনে ভোট না দেওয়া ৫৫ বছর বয়সী সাঈদ কাবাত আগামী ২৭ অক্টোবর প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রে যাবেন। তার কাছে এবারের ভোটটি কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগ নয়, বরং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আবারও কোনো উগ্র ডানপন্থী সরকার ক্ষমতায় এলে ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে।

উত্তর ইসরায়েলের মাজদ আল-ক্রুম আরব গ্রামের এই ফার্মাসিস্ট জানান যে, অতীতে তিনি সবসময় ভোট বয়কট করতেন। কিন্তু এবার তিনি ভোট দিতে যাবেন। তার আশঙ্কা, আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভোটের হার কম হলে বর্তমান শাসক জোটের উগ্র ডানপন্থী অংশ আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব ইসরায়েলিরা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর যেসব ফিলিস্তিনি দেশের ভেতরে রয়ে গিয়েছিলেন, এটি মূলত তাদেরই বংশধর। ইসরায়েলের ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর তুলনায় তারা দীর্ঘকাল ধরে নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন।

অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচন ইসরায়েলের আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় সংগঠিত হওয়ার আহ্বান তৈরি করেছে। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আমলে তাদের পরিস্থিতি আরও বেশি শোচনীয় হয়ে পড়েছে। উগ্র ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের প্ররোচনায় অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি নির্মাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং এখন তাদের নজর পড়েছে ইসরায়েলের ভেতরে থাকা আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ওপর।

গত সেপ্টেম্বর মাসে মাজদ আল-ক্রুম গ্রামে কাবাতের পরিবারের মালিকানাধীন জমিতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং নতুন বসতি স্থাপন করতে আসা ইহুদিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ইসরায়েলি পুলিশ ওই অবৈধ বসতিটি উচ্ছেদ করে। স্মোট্রিচের সমর্থনেই মূলত এটি তৈরি করা হয়েছিল। স্মোট্রিচ এমনকি ওই স্থানে একটি জনসভাও করেছিলেন এবং গত আগস্ট মাসে ইসরায়েলের আরব অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে ইহুদীকরণের একটি পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছিলেন।

ঐতিহ্যগতভাবেই ইসরায়েলের সামগ্রিক ভোটারের তুলনায় আরব সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভোটের হার সবসময় কম থাকে। সর্বশেষ ২০২২ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে আরব ও দ্রুজ ভোটারদের মধ্যে ভোটদানের হার ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ। অথচ সে সময় দেশজুড়ে সামগ্রিক ভোটের হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ।

মাজদ আল-ক্রুম গ্রামে ৩১ বছর বয়সী দানা সালামাহের মতো কর্মীরা ভোটের গুরুত্ব বোঝাতে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি জানান যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকলে যে ভয়াবহ বিপদ ঘনায়ে আসছে, তা এখন গ্রামের বয়কটকারী ও ভোট নিয়ে উদাসীন মানুষসহ সবাই খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পারছে।

আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে আরবদের ভোট দুটি ভিন্ন তালিকায় প্রতিদ্বন্দ্বী চারটি দলের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। চরম বামপন্থী জয়েন্ট লিস্ট বা যৌথ তালিকায় তিনটি দল একত্রিত হয়েছে। অন্যদিকে রআম বা ইউনাইটেড আরব লিস্ট দলটি ডানপন্থীদের সঙ্গে দরকষাকষিতে বেশ নমনীয়। রআম ২০২১ থেকে ২০২২ সালের কোয়ালিশন সরকারে যোগ দেওয়া প্রথম আরব দল এবং এবারও তারা কিংমেকার বা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

সম্প্রদায়ের ভেতরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ক্রমবর্ধমান হারও মানুষকে ভোটকেন্দ্রের দিকে ধাবিত করতে পারে। সহাবস্থান বিষয়ক সংস্থা আব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সহিংস অপরাধের ঘটনায় অন্তত ১৭৫ জন আরব নাগরিক নিহত হয়েছেন। মূলত অপরাধী গ্যাংগুলোই এই সহিংসতার প্রধান হোতা। আরব ইসরায়েলিরা এজন্য মন্ত্রী বেন গভিরের অধীনস্থ পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকেই দায়ী করছেন।

প্রায় ১৭ হাজার মানুষের আবাসস্থল মাজদ আল-ক্রুম গ্রামে যৌথ তালিকার নির্বাচনী পোস্টারে ছেয়ে গেছে। সেখানে লেখা রয়েছে পরিবর্তনের চাবিকাঠি এখন তাদের হাতেই। দেশের অন্যান্য আরব জনপদের মতো এই গ্রামেরও বেশ কয়েকটি বাড়ি বর্তমানে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকির মুখে রয়েছে।

আরও দক্ষিণে নেগেভ মরুভূমিতে ইসরায়েলি বুলডোজার সম্প্রতি আল-দাহিয়া নামক বেদুইন গ্রামের প্রায় ৮০টি স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে প্রায় ৪০০ মানুষ বসবাস করতেন। এই উচ্ছেদের ফলে আদনান আবু ওয়াদি তার চার সন্তানসহ সম্পূর্ণ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। তিনি জানান যে, এই উচ্ছেদ অভিযান নির্বাচনী চমক ছাড়া আর কিছু নয় এবং মানুষ এবার নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য আরব হিসেবে ভোট দিয়ে এই সরকারকে বদলাতে এবং চরমপন্থীদের হটাতে বদ্ধপরিকর।

banner
Link copied!