একসময় কাবুলের অলিগলি মুখর থাকত সঙ্গীতে। ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও ঐতিহাসিক সঙ্গীত পাড়ার বাতাসে ভেসে বেড়াত সুরের মূর্ছনা। কিন্তু আফগানিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশটিতে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানো এবং গান শোনা নিষিদ্ধ করা হয়।
দুই হাজার একুশ সালে ক্ষমতায় আসা কর্তৃপক্ষ কেবল বাদ্যযন্ত্র ছাড়া ধর্মীয় কণ্ঠসংগীত বা নাশিদ বাদে সব ধরনের সঙ্গীতচর্চা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সদ্গুণ প্রচার ও অসদাচরণ প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়ের নৈতিকতা রক্ষা পুলিশ এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করছে।
ক্ষমতা পরিবর্তনের পরপরই অনেক শিল্পী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। যারা দেশেই থেকে গেছেন, তারা নিজেদের বাদ্যযন্ত্র বিদেশে পাঠিয়ে দেন অথবা কর্তৃপক্ষের ভাঙচুরের হাত থেকে বাঁচাতে সেগুলোকে মাটির নিচে বা ঘরের কোণায় লুকিয়ে রাখেন।
কাবুলের ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতশিল্পীদের পাড়া কুচা-ই-খারাবাদের দোকানগুলোতে এখন আর বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয় না। এর বদলে মুদিপণ্য, খাবার, কাপড় ও অন্যান্য গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। এই নীতির কারণে রাতারাতি জীবিকা হারিয়েছেন দেশের হাজারো সঙ্গীতশিল্পী।
তারপরেও গ্রেপ্তার আতঙ্কের ঝুঁকি নিয়েও কেউ কেউ গোপনে বাদ্যযন্ত্র বের করে সুর তোলেন। শহরের এক সরু গলির ছোট একটি ঘরে সম্প্রতি এক শিল্পী তিনটি হাতে খোদাই করা কাঠের রবাব বের করেন, যা আফগান সংস্কৃতির প্রধান ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র।
গ্রেপ্তারের ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই রবাব বাদক বলেন, বেঁচে থাকা পর্যন্ত আমি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে যাব। হয়তো তা গোপনে করব, কিন্তু রবাবকে নীরব হতে দেব না। এটি আমাদের সংস্কৃতি এবং আফগানিস্তানের ঐতিহ্য, যা কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে পারে না। একে পুনরুজ্জীবিত করতে আমি লড়াই চালিয়ে যাব।
নগরীর অন্য অংশে আরেক গায়কও একই ধরনের দৃঢ়তার কথা জানান। ক্ষমতা পরিবর্তনের আগে তিনি নিয়মিত কনসার্ট ও উৎসবে গান গাইতেন। তবে এখন তিনি একটি রবাব, একটি হারমোনিয়াম, একটি বাঁশি, একটি তবলা এবং একটি কিবোর্ড লুকিয়ে রেখেছেন।
ওই গায়ক বলেন, যেদিন বাদ্যযন্ত্রগুলো বাড়িতে এনে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রেখেছিলাম, সেদিন মনে হয়েছিল ওই কাপড়ের নিচেই আমাকে জীবিত কবর দেওয়া হয়েছে। যেন আমি মারা গেছি। সঙ্গীত আমাকে জীবন দিয়েছিল, খ্যাতি এনে দিয়েছিল। সঙ্গীত ছাড়া একজন শিল্পী আত্মাহীন লাশের মতো।
ওই রবাব বাদক অতীতে একটি স্কুলে সঙ্গীত শেখাতেন এবং তার একটি বাদ্যযন্ত্রের দোকান ছিল, যেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার আফগানি আয় হতো। বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করে তার দৈনিক আয় মাত্র ১০০ আফগানি এবং স্ত্রী-সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে তাকে মারাত্মক সংগ্রাম করতে হয়। পারিবারিক ব্যবসা বন্ধ হওয়ার ঠিক পরপরই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার বাবা মারা যান। ব্যবসার দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার মানসিক ধাক্কাকেই তিনি পিতার মৃত্যুর কারণ হিসেবে মনে করেন।
ঝুঁকি মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় শুরুর দিকে গোপনে যে জলসা বা আসর বসত, তাও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। নীতি পুলিশ এক গোপন আসরে হানা দেওয়ার পর রবাব বাদক সেখান থেকে পালিয়ে যান, কারণ এক অতিথি সেই আসরের ছবি কর্তৃপক্ষের কাছে ফাঁস করে দিয়েছিলেন। আর ওই গায়ক সর্বশেষ চার বছর আগে একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন।
কারাদণ্ডের হুমকি সত্ত্বেও ওই রবাব বাদক তার জ্যেষ্ঠ ছেলেকে এই শিল্পকলার প্রশিক্ষণ দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। তিনি বলেন, আমাদের এই ঐতিহ্য যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখতে হবে।
