সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

গাজা সংকট

গাজায় তীব্র হচ্ছে মানবিক বিপর্যয়: অনাহারকে নির্বাচনী হাতিয়ার বানিয়েছে ইসরায়েল

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

গাজায় তীব্র হচ্ছে মানবিক বিপর্যয়: অনাহারকে নির্বাচনী হাতিয়ার বানিয়েছে ইসরায়েল

গাজা উপত্যকায় ক্ষুধা ও অবনতিশীল মানবিক পরিস্থিতি এখন ইসরায়েলি রাজনীতির প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির গত মঙ্গলবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। তাঁর জিউইশ পাওয়ার পার্টির নির্বাচনী এজেন্ডার অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজার দৃশ্য এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

এই উপত্যকায় এখন চারটি পৃথক সংকট থাবা বসিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ লাখ মানুষের খাদ্য সহায়তা বন্ধ হওয়া, জ্বালানি সংকটে হাসপাতালগুলোর সেবা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকার সম্প্রসারণ এবং হু হু করে বাড়তে থাকা প্রাণহানি। গত ১০ অক্টোবর ২০২৫ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও বোমাবর্ষণ, গুলিবর্ষণ ও ত্রাণ সরবরাহে বাধা অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি গত ১৯ অক্টোবর ঘোষণা করে যে তারা গাজায় খাদ্য সহায়তা এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিয়েছে। এই হ্রাসের ফলে প্রায় পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং সুবিধাভোগীর সংখ্যা সেপ্টেম্বরের ১৬ লাখ থেকে কমে অক্টোবরের ১১ লাখে নেমে এসেছে। খাদ্য প্যাকেজের পরিমাণ অর্ধেক করা এবং আটার সরবরাহ কমানোর মতো পদক্ষেপও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সংস্থাটি প্রতিদিনের গরম খাবার বিতরণও আড়াই লাখ থেকে কমিয়ে দেড় লাখে নামিয়ে এনেছে। দুর্গম এলাকার পরিবারগুলো, বিশেষ করে হলুদ রেখার কাছাকাছি বসবাসকারীরা এখন একদিন পর পর খাবার পাচ্ছে। তহবিল সংকটকে এর জন্য দায়ী করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি জানিয়েছে যে ২০২৬ সালের জন্য অর্থায়ন আগের পরিমাণের অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে এবং আগামী মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত গাজা ও পশ্চিম তীরে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে তাদের ৪৫ কোটি ডলার প্রয়োজন।

ইসরায়েলের ত্রাণ প্রবেশে নানা বাধার কারণে মানবিক কার্যক্রম বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দফতর গত ১৯ অক্টোবর জানিয়েছে যে ত্রাণ বহর তল্লাশি প্রক্রিয়া, সীমিত ক্রসিং ক্ষমতা এবং সমন্বয় বিধিমালার কারণে ক্রমাগত সমস্যার মুখে পড়ছে। গাজার সরকারি কর্মকর্তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি সরকার গত ২০ অক্টোবর শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে অপুষ্টির হার বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করেছে।

হাসপাতালগুলোর কার্যক্রমও একযোগে স্থবির হয়ে পড়ছে। গত ২১ অক্টোবর গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ঘোষণা করেন যে জেনারেটরের জ্বালানি স্টক ফুরিয়ে গেছে। অবশিষ্ট জেনারেটরগুলো যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার ফলে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি থমকে যেতে পারে। বিদ্যুৎহীন এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলো সচল রাখতে মাসিক আড়াই হাজার লিটারেরে বেশি জ্বালানি প্রয়োজন।

মন্ত্রণালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেইনটেন্যান্স বিভাগের মহাপরিচালক মাজন আল-আরাইশি গত ১৩ সেপ্টেম্বর জানান যে অনুমדיত জ্বালানির পরিমাণ জেনারেটর চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ইসরায়েল বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার পর এবং উপত্যকার একমাত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে গাজার হাসপাতালগুলো সম্পূর্ণভাবে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে আসছে। এই জেনারেটরগুলো দিয়েই অপারেশন থিয়েটার, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, নবজাতকদের ইনকিউবেটর, ভেন্টিলেটর এবং ডায়ালাইসিস মেশিন সচল রাখা হয়।

এদিকে যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহারের কথা থাকলেও তারা হলুদ রেখার সীমানা পশ্চিম দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও প্রসারিত করছে। হলুদ রেখা হলো প্রাথমিক সেনা প্রত্যাহারের সীমানা, যা সামরিক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলকে ফিলিস্তিনিদের এলাকা থেকে আলাদা করেছে। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার সময় গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে ছিল।

গত ১১ অক্টোবর ইসরায়েলি বাহিনী গাজা সিটির পূর্বে শুজাইয়া এলাকার ভেতরে কয়েক মিটার এগিয়ে আসে এবং কংক্রিটের সীমানা পিলার পশ্চিম দিকে সরিয়ে নেয়। এর ফলে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। গত ১৯ অক্টোবর জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দফতর সীমানা পিলার সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত ২ সেপ্টেম্বর ঘোষণা দেন যে ইসরায়েল হলুদ রেখা থেকে সরে আসবে না এবং এই সীমানা পরিবর্তনকে হামাসের অস্ত্র জমা দেওয়ার সাথে যুক্ত করেন। হামাস এর জবাবে জানায় যে তারা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ধীরে ধীরে সেনা প্রত্যাহারের শর্ত সাপেক্ষে অস্ত্র বিষয়ক আলোচনায় বসতে প্রস্তুত রয়েছে।

সামরিক নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে গত ২ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা গত সেপ্টেম্বরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে উঠে এসেছে। অক্টোবরের ওই নির্দিষ্ট সময়ে ৯৫ জনের মৃত্যুর রেকর্ড করা হয়েছে, যা সেপ্টেম্বরে ছিল ৬৮ জন। যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় মোট মৃতের সংখ্যা ২১ অক্টোবর পর্যন্ত দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৩৪ জনে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে সামরিক আগ্রাসনে ৭৪ হাজার ৪৯৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬০৪ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে।

banner
Link copied!