হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশের সময় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তেহরানের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে মার্কিন নৌবাহিনীর কোনো জাহাজ আক্রান্ত হয়নি এবং ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা বাহিনীগুলো ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখার পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এর আগে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস দাবি করেছিল যে তেহরানের সতর্কতা উপেক্ষা করে প্রণালীতে প্রবেশের চেষ্টা করলে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে জাস্ক দ্বীপের কাছে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং আঘাতের পর মার্কিন জাহাজটি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। তবে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে তারা সরাসরি হামলা নয় বরং মার্কিন জাহাজটিকে প্রণালীতে প্রবেশ থেকে বিরত রাখতে সতর্কতা স্বরূপ গুলি ছুড়েছে। তবে সেই গুলিতে মার্কিন জাহাজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না তা এখনো অস্পষ্ট বলে ইরানের সামরিক বাহিনী থেকে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ইরান তার আকাশসীমা ও জলসীমা রক্ষায় ‘আগ্রাসী মার্কিন সেনাবাহিনী’সহ যেকোনো বিদেশি শক্তির ওপর হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বা প্রকল্প স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালীতে আটকা পড়া প্রায় ২ হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ২০ হাজার নাবিককে নিরাপদে বের করে আনা। ট্রাম্প এই উদ্যোগকে একটি ‘মানবিক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন যে নির্দোষ দেশগুলোর জাহাজগুলো যুদ্ধের শিকার হতে পারে না। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই মানবিক কাজে কেউ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।
সেন্টকম জানিয়েছে যে প্রজেক্ট ফ্রিডম সফল করতে প্রায় ১৫ হাজার মার্কিন সেনা সদস্য, বেশ কিছু গাইডেড-মিসাইল ডেসট্রয়ার এবং ১০০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান অংশ নিচ্ছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও প্রণালীটি এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান হুমকি দিয়েছে যে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় না করে প্রণালীতে যেকোনো ধরনের জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করা হলে তাকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে। এই পাল্টাপাল্টি হুমকির ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহণ করা হয়। ইরানের অবরোধের ফলে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশেই জ্বালানি সংকট এবং আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে। জিসিসি বা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এই সংকট আরও প্রকট কারণ তাদের খাদ্য আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই এই পথ দিয়ে আসে। ফলে হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতার ওপর এখন পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করছে।
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের আলোচনা বেশ ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে এবং একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর এবং আমেরিকার তা অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে যে উত্তেজনার পারদ এখনো নিচে নামেনি। বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনী ওমানি জলসীমা ব্যবহার করে একটি বিকল্প রুট তৈরির চেষ্টা করছে যাতে ইরানি মাইন এবং ছোট দ্রুতগামী নৌকার আক্রমণ থেকে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে রক্ষা করা যায়। তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়; বরং চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত সামরিক অঞ্চলে পরিণত হয়ে থাকবে।
