সোমবার, ০৪ মে, ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

ব্রিটেনের সমুদ্রতলে ‘অ্যালার্মিং’ দূষণ, বিপন্ন সামুদ্রিক বনাঞ্চল

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৪, ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

ব্রিটেনের সমুদ্রতলে ‘অ্যালার্মিং’ দূষণ, বিপন্ন সামুদ্রিক বনাঞ্চল

যুক্তরাজ্যের উপকূলীয় নদ-নদী থেকে আসা নর্দমার বর্জ্য এবং কৃষিজ সার দেশটির সমুদ্রতলের ‘অ্যালার্মিং’ বা ভয়াবহ ক্ষতি করছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। সমুদ্রের অগভীর অংশে থাকা সিগ্রাস মিডোজ বা জলতলে বনাঞ্চলগুলো মূলত অগণিত সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের তৈরি এই দূষণ সেই পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রজেক্ট সিগ্রাস যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। তারা দেখেছেন যে বর্জ্য ও সারের প্রভাবে পানিতে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ছোট ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী যেমন কাঁকড়া, চিংড়ি এবং শামুকের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

গবেষক দলের প্রধান ডক্টর বেঞ্জামিন জোনস জানিয়েছেন যে মানুষ সাধারণত নর্দমার বর্জ্য মেশা নোংরা পানিতে সাঁতার কাটতে চায় না। তবে এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হয়েছে যে এই বর্জ্য কেবল মানুষের জন্য নয় বরং সমুদ্রতলের প্রাণীদের ওপরও সমান বিধ্বংসী প্রভাব ফেলছে। সিগ্রাস বা সামুদ্রিক ঘাসবন মূলত ফুল ফোটা উদ্ভিদ যা উপকূলের অগভীর ও শান্ত এলাকায় ঘন চাদরের মতো বনাঞ্চল তৈরি করে। এই বনাঞ্চলগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে দেখা হয় কারণ তারা বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে মাটিতে জমা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে মাত্র এক হেক্টর আয়তনের একটি সিগ্রাস মেডো প্রায় ১০ কোটি ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে।

প্রজেক্ট সিগ্রাসের গবেষকরা ব্রিটেনের উপকূলের ১৬টি ভিন্ন এলাকায় এই জরিপ চালিয়েছেন। এর মধ্যে মোহনা, লেগুন এবং দ্বীপ সংলগ্ন এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা দেখেছেন যেখানে পানিতে নাইট্রোজেন এবং ফসফরাসের মতো পুষ্টি উপাদানের আধিক্য বেশি সেখানে জীববৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণত কৃষিজমির সার, পশুর মলমূত্র এবং শিল্পবর্জ্য নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে গিয়ে মেশে। এই অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতিতে সমুদ্রতলে অতিমাত্রায় শ্যাওলা জন্মায় যা সিগ্রাস বা সামুদ্রিক ঘাসগুলোকে ঢেকে ফেলে। এর ফলে সূর্যের আলো ঘাসের গোড়ায় পৌঁছাতে পারে না এবং পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে পুরো সামুদ্রিক বনটি ধ্বংস হয়ে যায়।

সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডক্টর রিচার্ড আনসওয়ার্থ এই গবেষণার ফলাফলকে অত্যন্ত কঠোর এবং স্পষ্ট বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে এই সামুদ্রিক বনাঞ্চলগুলোকে যদি আমরা স্থলের বনের সাথে তুলনা করি তবে এই অমেরুদণ্ডী প্রাণীরা হলো বনের পতঙ্গের মতো যারা সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এই প্রাণীদের অনুপস্থিতিতে পুরো ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্যের উপকূলীয় এলাকায় এই পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে অনেক স্থানে নতুন বাড়ি নির্মাণে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে হয়েছে। এমনকি কৃষিজমিতে সার এবং গোবর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে যাতে তা নদীর পানিতে মিশতে না পারে।

লুইস এম জেফরি নামের এক আলোকচিত্রী এই গবেষণার সময় উপকূলীয় জীবনের কিছু বিরল দৃশ্য ধারণ করেছেন। সেখানে দেখা গেছে কীভাবে দূষিত সিগ্রাস বেডগুলোতে প্রাণীরা টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। সিগ্রাস কেবল প্রাণীদের খাবার ও আশ্রয় দেয় না বরং এটি সমুদ্রের ঢেউয়ের ঝাপটা থেকে উপকূলকে রক্ষা করে। যদি এই বনাঞ্চলগুলো হারিয়ে যায় তবে উপকূলীয় ভূমিক্ষয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে কার্বন শোষণের হার কমে যাওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। এদিকে পরিবেশবাদীরা সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছেন যেন নদ-নদীতে সরাসরি নর্দমার বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা হয়। তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়; বরং কৃষিখাতের আধুনিকায়ন এবং শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন না আনলে ব্রিটেনের এই অমূল্য সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।

banner
Link copied!