সোমবার, ০৪ মে, ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

মুমিনের জীবনে আল্লাহ তাআলার হক বা প্রাপ্য আদায়ের গুরুত্ব

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৪, ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

মুমিনের জীবনে আল্লাহ তাআলার হক বা প্রাপ্য আদায়ের গুরুত্ব

মানুষের জীবন কেবল খাওয়া-দাওয়া আর পার্থিব আরাম-আয়েশের জন্য নয় বরং প্রতিটি নিঃশ্বাসের পেছনে এক মহান উদ্দেশ্য কাজ করে। ইসলামি জীবনদর্শনে অধিকার বা হককে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে যার একটি হলো আল্লাহর হক বা হাক্কুল্লাহ এবং অন্যটি হলো বান্দার হক বা হাক্কুল ইবাদ। এর মধ্যে আল্লাহ তাআলার হক হলো সৃষ্টির ওপর স্রষ্টার সেই পাওনা যা আদায় করা প্রতিটি মুমিনের জন্য বাধ্যতামূলক। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার যে আল্লাহ আমাদের ইবাদতের মুখাপেক্ষী নন বরং আমরাই তাঁর অনুগ্রহের কাঙাল। সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত আমাদের যা কিছু আছে তার সবকিছুর প্রকৃত মালিক তিনি। ফলে তাঁর দেওয়া জীবন ও সম্পদে তাঁর নির্ধারিত বিধান পালন করাই হলো তাঁর হক আদায়ের মূল ভিত্তি।

আল্লাহ তাআলার হকের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান ও মৌলিক হক হলো তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ কেবল তাঁরই ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ নিজেই মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি (সূরা আদ-ধারিয়াত, ৫১:৫৬)। এই ইবাদত কেবল নামাজ বা রোজা পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং কাজে আল্লাহর হুকুমকে প্রাধান্য দেওয়াও ইবাদতের অংশ। মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তুমি কি জানো বান্দার ওপর আল্লাহর হক কী? অতপর তিনি নিজেই উত্তর দিলেন যে আল্লাহর হক হলো বান্দা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না (সহীহ আল-বুখারী, ২৮৫৬)। এটিই হলো ইসলামের মূল ভিত্তি বা কালিমা তায়্যিবার দাবি যা পূরণ করা ছাড়া কোনো আমলই গ্রহণযোগ্য হয় না।

আল্লাহর হকের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আনুগত্য বা নিঃশর্ত সমর্পণ। আমাদের জীবনে যা কিছু কল্যাণকর তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে এবং যা অকল্যাণকর তা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশও তিনি দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা চান বান্দা যেন তাঁর আদেশগুলো পালন করে এবং নিষেধগুলো থেকে দূরে থাকে। যখন একজন মুমিন আল্লাহর নিষিদ্ধ করা কোনো কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখে কেবল তাঁকে খুশি করার জন্য তখনই সে আল্লাহর হক আদায় করে। অনেকে মনে করেন কেবল তসবিহ পাঠ করলেই আল্লাহর হক আদায় হয়ে যায় কিন্তু এখানে আসল ব্যাপার হলো অন্তরের তাকওয়া। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা তাঁকে যথাযথভাবে ভয় করি এবং প্রকৃত মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ না করি (সূরা আল-ইমরান, ৩:১০২)। এই যথাযথ ভয় বা তাকওয়াই মানুষকে পাপাচার থেকে রক্ষা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে।

আল্লাহর আরও একটি পাওনা বা হক হলো আমাদের জীবনের প্রতিটি প্রাপ্তিতে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আমাদের চোখের দৃষ্টি, হৃদপিণ্ডের স্পন্দন এবং চলার শক্তি—সবই তাঁর বিশেষ দান। অথচ আমরা অনেক সময় এই নেয়ামতগুলোর শোকরিয়া আদায় করতে ভুলে যাই। কৃতজ্ঞতা আদায়ের সহজ পথ হলো আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে তাঁর অবাধ্যতায় ব্যয় না করা। কৃতজ্ঞ বান্দাদের জন্য আল্লাহ নেয়ামত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সাথে ইখলাস বা একাগ্রতা আল্লাহর হকের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা যা কিছু করব তা কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই হতে হবে। লৌকিকতা বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করা কোনো কাজ আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না। ইখলাসবিহীন ইবাদত মূলত একটি প্রাণহীন দেহের মতো যা কোনো উপকারে আসে না।

এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় হলো আল্লাহর হক আদায়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা। অনেক সময় মানুষ কেবল হাক্কুল ইবাদ বা মানুষের সেবাকেই ধর্ম মনে করে আল্লাহর হক যেমন নামাজ বা হজকে অবহেলা করে। আবার কেউ কেউ কেবল মসজিদে সময় কাটিয়ে মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করে। ইসলাম শেখায় যে এই দুটি হকই সমান্তরালভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে হাক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হকের ক্ষেত্রে তিনি পরম দয়ালু। যদি কোনো বান্দা তৌহিদের ওপর অটল থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তবে তিনি তাকে মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু আল্লাহর হকের মধ্যে যা শির্ক বা অংশীবাদ তা তিনি কখনোই ক্ষমা করেন না যদি না বান্দা তওবা করে ফিরে আসে। ফলে আল্লাহর হক আদায়ের প্রথম ধাপই হলো আকিদাকে পরিশুদ্ধ করা এবং যাবতীয় শিরক থেকে মুক্ত থাকা।

পরিশেষে বলা যায় আল্লাহ তাআলার হক আদায় করা আমাদের জন্য কোনো দয়া নয় বরং এটি আমাদের অস্তিত্বের দাবি। আমরা যখন সেজদায় মাথা নত করি তখন মূলত আমাদের শ্রেষ্ঠত্বই প্রকাশিত হয় কারণ আমরা মহাবিশ্বের মহান অধিপতির সামনে মাথা নত করছি। আল্লাহর প্রতিটি বিধান যেমন নামাজ কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা এবং সামর্থ্য থাকলে হজ পালন করা—এগুলো সবই হাক্কুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত। এই হকগুলো পালনের মাধ্যমেই একজন মানুষ প্রকৃত মুমিন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। দুনিয়ার জীবনে শান্তি এবং পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত করতে হলে আল্লাহর হকের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ মনোযোগী হতে হবে। স্রষ্টার হক আদায় না করে সৃষ্টির হক পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করাও অসম্ভব কারণ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থেকেই মানুষের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা জন্ম নেয়।

banner
Link copied!