পবিত্র ঈদুল আজহা সমাগত হলে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোরবানি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো ভাগে কোরবানি। সামর্থ্যবানরা এককভাবে পশু জবাই করলেও মধ্যবিত্ত বা সাধারণ আয়ের মানুষের জন্য অনেক সময় একা একটি বড় পশু কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় ইসলামি শরীয়ত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কোরবানির একটি সুন্দর ও সহজ বিধান রেখেছে। তবে এই ভাগের কোরবানি বা শরিকানা ইবাদতটি কবুল হওয়ার জন্য কিছু মৌলিক শর্ত ও নিয়ম মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
ইসলামের ফিকহ ও সহীহ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় পশু অর্থাৎ গরু, মহিষ এবং উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি অংশীদার হতে পারেন। এই বিধানটি সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—`আমরা হুদায়বিয়ার বছর রাসূল (সা.)-এর সাথে কোরবানি করেছি; একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে` (সহীহ মুসলিম, ১৩১৮)। সুতরাং সাতজন পর্যন্ত শরিক হওয়া নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। তবে ছোট পশু যেমন ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার ক্ষেত্রে কেবল একজনই কোরবানি দিতে পারবেন। এখানে কোনোভাবেই অংশীদারিত্ব বৈধ নয়।
ভাগে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো প্রত্যেকের নিয়ত। শরিকদের সবার উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যদি সাতজনের মধ্যে একজনের নিয়তও কেবল মাংস খাওয়া বা লোকদেখানো হয়, তবে বাকি কারো কোরবানিই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। এটি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তাই শরিক নির্বাচনের সময় সতর্ক থাকা উচিত যে, তারা সবাই যেন হালাল উপার্জনে বিশ্বাসী এবং খালেস নিয়ত সম্পন্ন মুমিন হন।
──────────────────────────────────────── মাংস বন্টন ও পাল্লায় মাপার গুরুত্ব ────────────────────────────────────────
ভাগে কোরবানির ক্ষেত্রে মাংস বন্টন নিয়ে অনেক সময় অবহেলা দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে মাংস ভাগ করা হয়, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে ত্রুটিযুক্ত। শরিকানা কোরবানিতে মাংস বন্টন অবশ্যই ওজন করে বা পাল্লায় মেপে করতে হবে। অনুমানের ওপর ভাগ করলে যদি কারো অংশে সামান্যও বেশি বা কম হয়, তবে সেটি সুদের পর্যায়ভুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে—যাকে ইসলামি পরিভাষায় `রিবাল ফজল` বা অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণের মতো মনে করা হয়। হাড়, মাংস এবং চর্বি—সবকিছুই সমান অনুপাতে বন্টন করা ওয়াজিব।
বন্টন শেষে প্রত্যেক শরিক তার প্রাপ্য অংশ থেকে পুনরায় তিন ভাগের নিয়ম অনুসরণ করবেন। অর্থাৎ এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এক ভাগ দরিদ্রদের জন্য। তবে কোনো শরিক যদি চান তার পুরো অংশটিই নিজের পরিবারের জন্য রাখবেন বা সবটুকুই দান করে দেবেন, তাতেও কোনো বাধা নেই। মূল লক্ষ্য হলো শরিকদের মধ্যে যেন কোনো প্রকার অসন্তুষ্টি বা অবিচার না থাকে।
──────────────────────────────────────── শরিকের সংখ্যা ও মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি ────────────────────────────────────────
সাতজন শরিক হওয়ার অর্থ এই নয় যে সাতজনই হতে হবে। বড় পশুতে দুই, তিন, চার বা পাঁচজন শরিক হওয়াও সমানভাবে জায়েজ। তবে প্রত্যেকের অংশ যেন কমপক্ষে সাত ভাগের এক ভাগ হয়। অর্থাৎ একটি গরুর আট ভাগের এক ভাগ বা নয় ভাগের এক ভাগ অংশ নেওয়া যাবে না। আবার কোনো ব্যক্তি যদি চান তার মৃত বাবা-মা বা আত্মীয়ের নামে একটি ভাগ রাখবেন, তবে সেটিও বৈধ। তবে এক্ষেত্রেও নিয়ত হতে হবে সওয়াব পৌঁছানো বা ঈসালে সওয়াব।
আরেকটি প্রচলিত প্রশ্ন হলো, কোরবানির শরিক হওয়ার জন্য পশু কেনার আগেই কি নাম ঠিক করতে হবে? নিয়ম হলো, পশু কেনার সময় যদি নিয়ত থাকে যে আমি অন্যদের সাথে মিলে এটি জবাই করব, তবে কেনার পরেও শরিক যুক্ত করা যায়। তবে শুরু থেকেই শরিক ঠিক করে নেওয়া উত্তম ও নিরাপদ। ভাগে কোরবানির ক্ষেত্রে জবাইয়ের সময় সবার নাম মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, অন্তরের নিয়তই যথেষ্ট। তবে তালিকা করে পশু জবাইকারীকে জানানো একটি ভালো ব্যবস্থাপনা।
ইসলামি জীবন দর্শনে কোরবানি একটি সামাজিক সংহতির প্রতীক। ভাগে কোরবানি দেওয়ার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, কোরবানির মূল স্পিরিট হলো তাকওয়া। পশু বড় কি ছোট, বা কতজন ভাগে দিচ্ছি—তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কতটা শুদ্ধ মনে আল্লাহর হুকুম পালন করছি। এই পবিত্র ইবাদত যেন কেবল প্রথায় পরিণত না হয়, বরং এর প্রতিটি ধাপে যেন সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণ থাকে, সেটিই আমাদের কাম্য।
