বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩

চাঁদ দেখে ইবাদতের সময় নির্ধারণের ইসলামি মূলনীতি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৪, ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

চাঁদ দেখে ইবাদতের সময় নির্ধারণের ইসলামি মূলনীতি

মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য চাঁদকে সময় গণনা এবং বিভিন্ন ইবাদতের সময় নির্ধারণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। ইসলামে চাঁদ দেখাকে কেবল একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান বা প্রাকৃতিক বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং একে ধর্মীয় ইবাদত ও শরিয়তের বিধান পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে নতুন চাঁদ দেখার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে এ বিষয়ে সচেতন থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। চাঁদ দেখার এই ইসলামি মূলনীতির ওপর আমাদের রোজা, ঈদ, হজ ও কোরবানির মতো মৌলিক ইবাদতগুলো নির্ভরশীল।

ইসলামি শরিয়তে চন্দ্র মাসের ওপর ভিত্তি করেই ধর্মীয় উৎসব ও ইবাদতের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। রমজানের রোজা রাখা, শাওয়ালের ঈদ উদযাপন, জিলহজের কোরবানি কিংবা মহররমের দিন গণনা—সবই চাঁদের উদয়ের সাথে সম্পৃক্ত। এ প্রসঙ্গে ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

অনুরূপভাবে আবু হুরায়রা (রা.) থেকেও একই ধরনের নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য চাঁদ দেখাই হলো ইবাদতের প্রধান অবলম্বন।

ইবাদতের সময় যাতে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সেজন্য চাঁদের হিসাব রাখার ক্ষেত্রে ইসলাম সর্বোচ্চ সতর্কতার তাগিদ দিয়েছে। বিশেষ করে শাবান মাসের দিন-তারিখ নিখুঁতভাবে গণনা করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এর ওপরই রমজান শুরুর বিষয়টি নির্ভর করে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের হিসাব যেভাবে যত্নসহকারে রাখতেন, অন্য কোনো মাসের ক্ষেত্রে এমনটি করতেন না। চাঁদ দেখা না গেলে তিনি জোর করে বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে রোজা শুরু করতেন না, বরং শাবান মাসকে ৩০ দিন পূর্ণ করে তবেই রমজানের রোজা রাখতেন।

পৃথিবীর গোলকৃতির কারণে সব দেশে বা অঞ্চলে একই সময়ে সূর্যোদয় বা চন্দ্রোদয় হয় না। এই ভৌগোলিক বাস্তবতাকে ইসলাম পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়েছে। একে শরিয়তের পরিভাষায় ‘ইখতিলাফে মাতালি’ বা উদয়াচলের পার্থক্য বলা হয়। এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য কোনো দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।

কুরাইব (রা.)-এর বর্ণিত একটি বিখ্যাত হাদিস থেকে জানা যায়, সিরিয়াতে শুক্রবার রাতে রমজানের চাঁদ দেখা গিয়েছিল এবং আমিরে মুয়াবিয়া (রা.)-এর নেতৃত্বে সিরিয়াবাসী শনিবার থেকে রোজা শুরু করেন। কিন্তু মদিনায় ইবনে আব্বাস (রা.) জানান যে তারা শনিবার রাতে চাঁদ দেখেছেন। সিরিয়ার চাঁদ দেখার সংবাদ মদিনায় পৌঁছানোর পরও ইবনে আব্বাস (রা.) তা মদিনাবাসীর জন্য গ্রহণ করেননি এবং বলেন, "রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এভাবেই (নিজ নিজ অঞ্চলে চাঁদ দেখে) রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।"

চাঁদ দেখার অর্থ এই নয় যে সমাজের প্রতিটি মানুষকে নিজ চোখে চাঁদ দেখতে হবে। শরিয়ত অনুযায়ী, যদি কোনো বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য ও আদেল (ন্যায়পরায়ণ) ব্যক্তি চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দেন, তবে সেই সংবাদ নিকটবর্তী বা একই ভূখণ্ডের সবার জন্য গ্রহণযোগ্য হবে। হাদিসে এসেছে, একবার রমজানের শেষ দিনে মানুষ চাঁদ দেখা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল। তখন দুজন বেদুইন এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আল্লাহর নামে শপথ করে সাক্ষ্য দিলেন যে তারা গত সন্ধ্যায় শাওয়ালের চাঁদ দেখেছেন। তাদের সাক্ষ্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত হওয়ায় আল্লাহর রাসুল (সা.) তাৎক্ষণিকভাবে সবাইকে রোজা ভাঙার এবং ঈদগাহে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

পরিশেষে বলা যায়, চাঁদ দেখার এই শরয়ি মূলনীতিমালার মধ্যে ইসলামের সহজতা, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক ঐক্যের এক অপূর্ব সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। ভৌগোলিক দূরত্বকে বিবেচনা করে এবং নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে ইসলাম উম্মাহর ইবাদতকে যেমন নিয়মতান্ত্রিক করেছে, তেমনি তা বাস্তবসম্মতও বটে।

banner
Link copied!