পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি এলেই মুসলিম উম্মাহর মধ্যে পশুর শরিকানা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এর মধ্যে অন্যতম একটি বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন হলো—দুই ভাই মিলে কোরবানির পশুর একটি মাত্র ভাগে বা নামে অংশ নিতে পারবেন কি না। ইসলামি শরিয়তের ফুকাহায়ে কেরাম ও আলেমদের মতে, এই বিষয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর নিয়মনীতি রয়েছে, যা না জানলে পুরো কোরবানিই বাতিল হয়ে যেতে পারে।
পশুর ধরন ও শরিকানার নিয়ম
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কোরবানির পশুর আকার ও ধরনের ওপর ভিত্তি করে শরিকানার সংখ্যা নির্ধারিত হয়। নিচে একটি সহজ তালিকার মাধ্যমে এটি তুলে ধরা হলো:
| পশুর ক্যাটাগরি | সর্বোচ্চ শরিক বা ভাগের সংখ্যা | এক ভাগে একাধিক ব্যক্তি? |
|---|---|---|
| ছাগল, ভেড়া, দুম্বা | ১ জন (কোনো শরিক চলবে না) | সম্পূর্ণ নাজায়েজ |
| গরু, মহিষ, উট | ৭ জন (৭টি ভিন্ন নাম/ভাগ) | ১টি ভাগে ২ জন থাকা নাজায়েজ |
ফতোয়া অনুযায়ী, ছোট পশুতে যেমন একাধিক ব্যক্তি শরিক হতে পারেন না, ঠিক তেমনি বড় পশুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারলেও, প্রতিটি একক ভাগের পেছনে কেবল একজন ব্যক্তির নাম ও নিয়ত থাকতে হবে। অর্থাৎ, একটি ভাগে বা একটি নামে দুইজন একসঙ্গে টাকা দিয়ে যৌথ অংশীদার হতে পারবেন না; এমনকি তারা যদি একই পরিবারের আপন দুই ভাইও হন, তবুও সেই ভাগটি শুদ্ধ হবে না।
এক ভাগে দুই নাম দিলে যা ঘটবে
যদি কোনো গরুর একটি নির্দিষ্ট ভাগে দুই ভাই মিলে টাকা দেন এবং দুইজনের নামেই সেই অংশটি কোরবানি করা হয়, তবে শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী কেবল ওই দুই ভাইয়ের কোরবানিই নষ্ট হবে না, বরং সেই গরুর বাকি যে অন্য অংশীদার বা শরিকরা থাকবেন, তাদের সবার কোরবানিও অশুদ্ধ বা বাতিল হয়ে যাবে। তাই এ বিষয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।
জায়েজ করার সঠিক ও শরয়ি উপায়
যদি দুই ভাই একসঙ্গে কোরবানি করতে চান কিন্তু বড় পশুর একটির বেশি ভাগ নেওয়ার সামর্থ্য না থাকে, তবে ইসলাম এর একটি সুন্দর সমাধান দিয়েছে:
১. কোরবানিটি যেকোনো এক ভাইয়ের নামে নির্দিষ্ট করতে হবে।
২. অন্য ভাই তাকে নিজের অংশের টাকাটি বা পশুর মালিকানা সম্পূর্ণ ‘হেবা’ বা উপহার হিসেবে দিয়ে দেবেন।
৩. পশুটি তখন সামাজিকভাবে এক ভাইয়ের নামেই জবাই হবে এবং তার ওয়াজিব বা নফল কোরবানি আদায় হয়ে যাবে।
কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর যৌথ পরিবারের অংশ হিসেবে সেই পশুর মাংস সবাই মিলে ভাগ করে খেতে কোনো বাধা নেই। ইসলামে যৌথ পরিবারে একসঙ্গে মাংস রান্না করে খাওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ ও বরকতময়। তবে মনে রাখতে হবে, যদি দুই ভাইয়ের ওপরই আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে (অর্থাৎ দুইজনের কাছেই নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে), তবে অবশ্যই তাদের আলাদাভাবে দুটি ভিন্ন ভাগে বা পশুতে কোরবানি দিতে হবে।
এ বিষয়ে সহীহ মুসলিমের একটি বিখ্যাত হাদিস রয়েছে, যেখানে হযরত জাবের (রা.) বলেন:
"আমরা আল্লাহর রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে হজের ইহরাম বেঁধে রওয়ানা হলাম। তিনি আমাদের উট ও গরু কোরবানির জন্য সাতজন করে শরিক হওয়ার নির্দেশ দিলেন।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৩১৮)
অতএব, ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত হলো সঠিক জ্ঞান। কোরবানি করার আগে শরিয়তের এই সূক্ষ্ম মাসআলাগুলো জেনে নেওয়া প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।
