ইউরোপের সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী দেশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ইতালিতে বর্তমানে শিশুদের স্থূলতা একটি মারাত্মক ও অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। বর্তমান সময়ের এই সংকট এতটাই গুরুতর আকার ধারণ করেছে যে অতিরিক্ত ওজনের কারণে অনেক শিশুকে তাদের স্থানীয় জিম বা শরীরচর্চা কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মাত্র দুই ও তিন বছরের শিশুরা ফলের রস এবং বিভিন্ন কোমল পানীয়ের প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছে যে তাদের সাধারণ পানি পান করানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট সমগ্র দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে।
ঐতিহ্যগতভাবে ভূমধ্যসাগরীয় সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং দীর্ঘ ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি থাকলেও আধুনিক ইতালির শিশুরা আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অতিরিক্ত ওজনের শিকার হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। জীবনযাত্রার এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন জটিল ও বহুমুখী সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পাস্তা, পি্জ্জা, আলু, রুটি এবং অতিরিক্ত আমিষ জাতীয় খাবারের আধিক্য এই অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এছাড়া বর্তমান প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা পরিবারের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী খাবার খাওয়ার পরেও বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খাচ্ছে, যা স্থূলতার সমস্যাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
শিশু এই অসংযমী খাদ্যাভ্যাসের জন্য অভিভাবক এবং পারিবারিক পরিচর্যার পদ্ধতিকেও অনেকে কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছেন। অনেক সমালোচকের মতে, ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের অতিরিক্ত ও অহেতুক খাবার বা মিষ্টিজাতীয় পানীয় খাইয়ে অতিরিক্ত আদর দেওয়ার মাধ্যমে অভিভাবকরা নিজেরাই এই নীরব স্বাস্থ্য সংকটের পথ প্রশস্ত করেছেন। তবে ক্রমবর্ধমান এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইতালি সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই বরং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে। ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে ইতালি প্রথম দিকেই স্থূলতাকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর রোগ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে, যা নীতিগত দিক থেকে একটি বড় পদক্ষেপ।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ক্যাম্পানিয়া অঞ্চলের পঁচিশটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একটি উচ্চাভিলাষী চিকিৎসা ও গবেষণা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। নেপলসসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে এই কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। একটি আসন্ন বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয় এড়ানো এবং নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশগুলোও ইতালির এই প্রচেষ্টার দিকে গভীর নজর রাখছে কারণ অনুরূপ সমস্যায় জর্জরিত রাষ্ট্রগুলো এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
নেপলস থেকে বিবিসির খ্যাতনামা সাংবাদিক সোফিয়া বেটিজা এই পুরো সংকটের নানা দিক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। চিকিৎসক এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীরা মনে করছেন যে শুধুমাত্র সরকারি নিষেধাজ্ঞা বা বিদ্যালয়ের পাইলট প্রজেক্ট দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে যাতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই একটি সুস্থ ও সুষম জীবনধারা বেছে নিতে পারে। ইতালি কি শেষ পর্যন্ত তাদের এই শিশু স্থূলতা সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে তবে বর্তমানের এই কঠোর পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
