রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩

২০০ মিলিয়ন বছরের পুরনো এক পাথর যেভাবে জীবন বদলে দিল

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩, ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম

২০০ মিলিয়ন বছরের পুরনো এক পাথর যেভাবে জীবন বদলে দিল

প্রকৃতি এবং বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব স্যার ডেভিড অ্যাটেনবারোর নাম শুনলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুর্গম অরণ্য কিংবা সমুদ্রের নীল জলরাশি। কিন্তু তার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের শুরুটা হয়েছিল খুব সাধারণভাবে, ইংল্যান্ডের লেস্টারশায়ারের গ্রামাঞ্চলে একটি সাইকেল এবং একটি ছোট হাতুড়ি নিয়ে। ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকের এক বিকেলে কিশোর ডেভিড সাইকেলে চড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন স্থানীয় এক পাথুরে পাহাড়ের সন্ধানে। সেখানে একটি ভাঙা পাথরের টুকরোকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতেই বেরিয়ে আসে কোটি বছরের প্রাচীন এক রহস্য। কুণ্ডলী পাকানো সেই সামুদ্রিক খোলস বা অ্যামোনাইটের উজ্জ্বল সৌন্দর্য কিশোর ডেভিডের মনে যে রোমাঞ্চ তৈরি করেছিল, তা পরবর্তী ৯ দশকেও ফিকে হয়ে যায়নি।

সেই বিশেষ মুহূর্তটির কথা স্মরণ করে ২০০৯ সালে অ্যাটেনবারো বলেছিলেন যে, তিনি যখন পাথরটি দুই ভাগ করেছিলেন, তখন তিনি এমন কিছু দেখেছিলেন যা গত ২০০ মিলিয়ন বছরে আর কোনো মানুষের চোখ দেখেনি। সেটি ছিল একটি প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণী যা একসময় পৃথিবীতে রাজত্ব করত। স্থানীয়ভাবে অনেকে এগুলোকে ‍‍`সাপের পাথর‍‍` বলে ভুল করত, কিন্তু আসলে সেগুলো ছিল সেফালোপড জাতীয় প্রাণী। সেই দিনটির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, এটি ছিল তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণ। সেই থেকে শুরু করে ৯৯ বছর বয়সেও তিনি সুযোগ পেলেই জীবাশ্ম খুঁজে বেড়ান। তার এই শখটি কেবল একটি বিনোদন ছিল না, বরং এটি ছিল পৃথিবীর বিবর্তন এবং প্রাকৃতিক ইতিহাস বোঝার প্রথম পাঠ।

লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতরেই ছিল অ্যাটেনবারো পরিবারের আদি নিবাস। আজ সেখানে বিজ্ঞানের গবেষণা চললেও এই চত্বরের প্রতিটি কোণায় অ্যাটেনবারো ভাইদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। স্যার ডেভিডের বড় ভাই লর্ড রিচার্ড অ্যাটেনবারোও বিশ্বখ্যাত একজন অভিনেতা ছিলেন। মজার বিষয় হলো, রিচার্ড ১৯৯৩ সালের ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র ‍‍`জুরাসিক পার্ক‍‍`-এ এমন এক ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যিনি প্রাচীন জীবাশ্ম থেকে ডাইনোসরের ডিএনএ বের করে একটি পার্ক তৈরি করেন। বাস্তব জীবনেও এই দুই ভাইয়ের জীবনের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল লেস্টারের সেই পাথুরে মাটিতে তাদের বাবার একাডেমিক ছত্রছায়ায়। তাদের বাবা ফ্রেডরিক অ্যাটেনবারো ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধ্যক্ষ এবং একজন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ।

সম্প্রতি লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ফ্রেডরিক অ্যাটেনবারোর ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকের কিছু চিঠি উদ্ধার করা হয়েছে। সেই চিঠিগুলোতে ফুটে উঠেছে এক কিশোরের কথা, যে তার চারপাশের ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ নিয়ে প্রচণ্ড কৌতূহলী ছিল। ফ্রেডরিক তার চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন যে, তার ছেলে ডেভিড পৃথিবী বিজ্ঞান বা আর্থ সায়েন্সকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী। যদিও বিশ্ব তাকে একজন টেলিভিশন উপস্থাপক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে চেনে, কিন্তু তার হৃদয়ের গহীনে তিনি সবসময়ই একজন ভূতাত্ত্বিক এবং প্রকৃতিবিদ হিসেবেই থেকে গেছেন। প্রকৃতিকে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করেছে এবং দর্শকদের কাছে তাকে এক নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বরে পরিণত করেছে।

অ্যাটেনবারোর এই জীবাশ্ম শিকারের গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মহান লক্ষ্যগুলোর বীজ অনেক সময় বপন করা হয় খুব সাধারণ কোনো কৌতুহল থেকে। ২০২৫ সালের মে মাসে নিজের ৯৯তম জন্মদিনের ঠিক পরেই এক চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন যে, লেস্টারশায়ারের সেই মাঠগুলো আজও তাকে ভীষণভাবে টানে। তিনি আজও বিশ্বাস করেন যে, একটি পাথরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোটি বছরের ইতিহাস জানার যে আনন্দ, তার চেয়ে বড় কোনো সম্পদ একজন প্রকৃতিবিদের জন্য হতে পারে না। তার জীবন এবং কাজ আজ কোটি কোটি মানুষকে প্রকৃতির সুরক্ষায় অনুপ্রাণিত করছে, যার শুরুটা হয়েছিল ২০০ মিলিয়ন বছরের পুরনো এক সামান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম দিয়ে।

উম্মাহ কণ্ঠের পাঠকদের জন্য অ্যাটেনবারোর এই জীবনদর্শন একটি বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। পৃথিবী এবং এর সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে অনুসন্ধান করার যে শিক্ষা আমাদের ইসলামি মূল্যবোধেও রয়েছে, অ্যাটেনবারোর কাজ যেন তারই এক আধুনিক প্রতিফলন। প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির আড়ালে যে মহান কারিগরের নিপুণ ছোঁয়া রয়েছে, তা অনুধাবন করতে হলে প্রয়োজন গভীর পর্যবেক্ষণ এবং ভালোবাসা, ঠিক যেমনটি আমরা দেখি স্যার ডেভিড অ্যাটেনবারোর দীর্ঘ এক শতকের এই পথচলায়।

banner
Link copied!