বিখ্যাত ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান তার পরবর্তী প্রজেক্ট ‘দ্য ওডিসি’ নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছেন। প্রায় ২ হাজার ৮০০ বছর আগে রচিত হোমারের এই মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিতব্য চলচ্চিত্রটি শুটিং শুরুর আগেই কাস্টিং, ঐতিহাসিক সত্যতা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের মতো গুরুতর প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। আল জাজিরা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছবিটি নিয়ে অনলাইনে এবং সাংস্কৃতিক মহলে তীব্র সমালোচনা চলছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রধান চরিত্র নির্বাচনের বিষয়টি। পরিচালক নোলান ঘোষণা করেছেন যে ট্রয়ের হেলেন চরিত্রে অস্কারজয়ী কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী লুпита নিওং’ও অভিনয় করবেন। হোমারের মূল কাব্যে হেলেনকে ‘শ্বেতাঙ্গ বাহু’ এবং ‘দেবতুল্য’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই বর্ণনার বিপরীতে একজন কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রীকে নির্বাচন করায় অনেকেই একে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ এবং ‘ওকনেস’ বা অতিরিক্ত রাজনৈতিক শুদ্ধতার চর্চা বলে অভিহিত করেছেন।
এই কাস্টিংয়ের প্রতিক্রিয়া দ্রুতই রাজনৈতিক রূপ নেয়। এক্সের (সাবেক টুইটার) মালিক ইলন মাস্ক সরাসরি পরিচালকের সমালোচনা করে একে ‘হোমারের কবরে প্রস্রাব করার’ শামিল বলে মন্তব্য করেন এবং নোলানকে ‘শ্বেতাঙ্গ বিরোধী বর্ণবাদী’ হিসেবে অভিযুক্ত করেন। মাস্কের মতে, পুরস্কারের মৌসুমে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ড বজায় রাখতেই নোলান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ডানপন্থী রাজনৈতিক ভাষ্যকার ম্যাট ওয়ালশও প্রশ্ন তোলেন যে লুпита নিওং’ওকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী নারী’ হিসেবে কেউ মনে করে কি না, যা হেলেনের পৌরাণিক খ্যাতির পরিপন্থী।
তবে এই সমালোচনার জবাবে শাস্ত্রীয় পণ্ডিতরা ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরছেন। তারা বলছেন, ইলিয়াড বা ওডিসি—কোথাও হোমার সরাসরি হেলেনকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী নারী’ বলে উল্লেখ করেননি। বরং তিনি বারবার ‘শ্বেতাঙ্গ বাহু’, ‘সুকেশী’, ‘জিউসের কন্যা’ এবং ‘দেবতুল্য’—এমন বিশেষণে তাকে ভূষিত করেছেন। হেলেন বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী নারী—এই ধারণাটি পরবর্তীকালের গ্রিক পুরাণ এবং প্যারিসের বিচারের গল্পে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সমালোচকদের কেউ কেউ আবার নোলানের সিদ্ধান্তের সমর্থনেও কথা বলেছেন। আমেরিকান লেখক ও ক্লাসিক্যাল স্কলার ড্যানিয়েল মেন্ডেলসোহন যুক্তি দিয়েছেন যে, ট্রয় চলচ্চিত্রে ম্যাট ডেমনের মতো অভিনেতাকে গ্রিক চরিত্রের জন্য নেওয়া হলেও তখন কোনো বিতর্ক হয়নি। তিনি আরও বলেন, পৌরাণিক চরিত্রের ক্ষেত্রে ‘ঐতিহাসিক সত্যতা’ খোঁজাটাই হাস্যকর, কারণ মূল উপাখ্যান অনুযায়ী হেলেন নিজেই একটি হাঁসের ডিম থেকে ফুটেছিলেন। তাই আক্ষরিক অর্থ খোঁজার চেয়ে শিল্পসম্মত ব্যাখ্যায় জোর দেওয়া উচিত।
কাস্টিং ছাড়াও চলচ্চিত্রটির অন্যান্য দিক নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রূপান্তরকামী অভিনেতা এলিয়ট পেজকে কাস্ট করার বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। গুজব ছিল যে তাকে মহাবীর অ্যাকিলিস চরিত্রে নেওয়া হতে পারে। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত ট্রোজান হর্সের কৌশলের সঙ্গে জড়িত একজন গ্রিক সৈনিকের চরিত্রে অভিনয় করছেন, তবুও নিউজম্যাক্সের মতো নেটওয়ার্কের অ্যাঙ্কররা এই নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। এছাড়া, র্যাপার ট্র্যাভিস স্কটকে ‘বার্ড’ বা চারণকবি হিসেবে নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নোলান ব্যাখ্যা করেছেন যে, এটি একটি ইঙ্গিত মাত্র যে এই গল্পটি মূলত মৌখিক কবিতার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়েছিল, যা আধুনিক র্যাপের সমতুল্য।
পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সংলাপের আধুনিকতা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। অনলাইনে অনেকে মন্তব্য করেছেন যে, আগামেননের বর্মটি ব্যাটম্যানের পোশাকের মতো দেখাচ্ছে এবং ওডিসিয়ের নৌকাটি একটি ‘ভাইকিং জাহাজের’ মতো। আবার মূল চরিত্রে টম হল্যান্ড যখন বলেন যে ‘আমার বাবা বাড়ি ফিরছেন’, তখন অনেক দর্শক মনে করেছেন যে এই মহাকাব্যিক গল্পের জন্য সংলাপটি খুব বেশি সাধারণ এবং আধুনিক হয়ে গেছে।
গ্রিসে এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে অসন্তোষের একটি ভিন্ন মাত্রা রয়েছে। দেশটির সাংবাদিক ক্রিস কটনউ লিখেছেন যে, গ্রিক সাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর হওয়া সত্ত্বেও হলিউড আবার কোনো গ্রিক অভিনেতাকে ছাড়াই এই ছবি তৈরি করছে। এটি তাদের জন্য বেদনাদায়ক। তার মতে, বিশ্বকে প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করা হলে, এই মহাকাব্যের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সংযুক্ত লোকজনকে একটি স্থান দেওয়া স্বাভাবিক ছিল। তবে হলিউডে গ্রিক অভিনেতাদের কাস্ট করার ইতিহাস বেশ দুর্বল। তাছাড়া, হোমারের কাজ শতাব্দী ধরে অগণিত সংস্কৃতি, ভাষা এবং শৈল্পিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে পুনর্কল্পনা করা হয়েছে, যা এই মহাকাব্যের ঐতিহ্যের একটি মূল অংশ।
