রয়টার্স ও বিবিসি নিউজের তথ্যমতে, বিশ্বখ্যাত জাপানি অবান্দগার্দ চিত্রশিল্পী ও পোলকা ডট জাদুকর ইয়ায়োই কুসামা গত চৌদ্দই আগস্ট টোকিওর একটি হাসপাতালে সাতানব্বই বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি তাঁর রঙিন পোলকা ডট ও উজ্জ্বল স্থাপনা শিল্পের জন্য বিশ্বজুড়ে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শিল্পকলার জগতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কুসামা স্বেচ্ছায় টোকিওর একটি মানসিক হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিয়মিত চিত্রকর্ম তৈরি করে গেছেন। ১৯২৯ সালে জাপানের নাগানো অঞ্চলের মাৎসুমোতো শহরে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে নিউইয়র্কের পুরুষপ্রধান শিল্প অঙ্গনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। রক্ষণশীল পরিবারের বাধা এবং শৈশবের হ্যালুসিনেশনের অভিজ্ঞতাকে তিনি তাঁর শিল্পকর্মের মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর নির্মিত অসীম আয়না কক্ষ এবং প্রকাণ্ড কুমড়ো আকৃতির ভাস্কর্যগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপরিসরে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
ষাটের দশকে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন বিতর্কিত ও নজরকাড়া প্রদর্শনী আয়োজন করেছিলেন, যা সেসময়ের রক্ষণশীল সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা তাঁর সৃজনশীল ধারণা ও কাজ অনুকরণ করার প্রবণতা তাঁকে মারাত্মকভাবে হতাশ করেছিল, যার ফলে তিনি পরবর্তীতে নিজের দেশে ফিরে আসেন। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত চিকিৎসার জন্য তিনি স্বেচ্ছায় একটি বিশেষ হাসপাতালে ভর্তি হন যেখানে চিকিৎসকদের সহযোগিতায় তিনি শিল্পচর্চা অব্যাহত রাখেন। এই নিরাপদ পরিবেশই তাঁকে নতুন উদ্যমে সৃষ্টিশীল কাজে নিমগ্ন হতে সাহায্য করেছিল।
বিশ শতকের শেষভাগ থেকে তাঁর শিল্পকর্মের জনপ্রিয়তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং তিনি প্রথম জাপানি নারী শিল্পী হিসেবে ১৯৯৩ সালের ভেনিস বিডালে নিজ দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন। লন্ডনের টেট মডার্ন গ্যালারিসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জাদুঘরগুলোতে তাঁর প্রদর্শনীগুলোতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দুই হাজার বাইশ সালে তাঁর একটি চিত্রকর্ম প্রায় এক কোটি পাঁচ লক্ষ ডলারে নিলামে বিক্রি হয়েছিল, যা নারী শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ রেকর্ড স্থাপন করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে তাঁর অনন্য নান্দনিক শৈলী তরুণ প্রজন্মের কাছে নতুন নজর কেড়েছিল।
শৈশবে দেখা নানা রঙের ফুল ও নকশার হ্যালুসিনেশনকে তিনি তাঁর শিল্পরীতির মূল উপজীব্য করেছিলেন। কুমড়োর মোটিফ তাঁর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিল কারণ এটি তাঁকে মানসিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি দিতো। আমৃত্যু তিনি রঙের তুলি হাতছাড়া করেননি এবং তাঁর সৃষ্টিতে মানবজাতির জন্য আশার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠانের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে কুসামা কখনো ব্রাশ হাত থেকে নামাননি এবং অনন্ত ভালোবাসা ও আত্মিক শান্তির খোঁজ চালিয়ে গেছেন। বিশ্বজুড়ে তাঁর অনুরাগী ও শিল্পপ্রেমীরা এই প্রখ্যাত শিল্পীর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীল কাজগুলো আগামী দিনেও সারা বিশ্বের শিল্পজগতে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সমকালীন আন্তর্জাতিক শিল্পকলায় কুসামার অবদান নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
