বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালীতে সাময়িক নৌপথ চালুতে সম্মত ইরান ও ওমান

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ২৬, ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

হরমুজ প্রণালীতে সাময়িক নৌপথ চালুতে সম্মত ইরান ও ওমান

ইরান এবং ওমান হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি সাময়িক সামুদ্রিক পথ চালুর বিষয়ে মঙ্গলবার এক সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে আল জাজিরা জানিয়েছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি তেহরানে এক ঘোষণায় জানান যে সাত মাইল প্রশস্ত এই সাময়িক ট্রানজিট করিডোরটি দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে ওয়াশিংটন চলতি বছরের জুন মাসে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত এই কৌশলগত জলপথটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে না।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকট তৈরি করে। বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে বলে এর অবরুদ্ধ অবস্থা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। যুদ্ধের শুরু থেকেই তেহরান এই প্রণালীর ওপর নিজেদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং কেবল নির্দিষ্ট কিছু বন্ধুভাবাপন্ন জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিয়ে আসছিল।

ওমানের সাথে নতুন এই সমঝোতার আওতায় সাময়িক ট্রানজিট রুটটি নির্ধারণ করা হলেও স্থায়ী পথ চূড়ান্ত করার জন্য আগামী ত্রিশ থেকে ষাট দিনের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে আরও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ইরানি কর্মকর্তাদের এই আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচল নিরাপদ করা এবং দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের প্রভাব কমানো। তবে তেহরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে মার্কিন প্রশাসন পূর্বের সমঝোতা লঙ্ঘন করে বিকল্প পথে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করায় পূর্ণাঙ্গ নৌপথ খোলার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মার্কিন পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই সাময়িক করিডোর চালুর সিদ্ধান্তকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওমান ও ইরানের যৌথ বিবৃতিতে এই অঞ্চলের অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথেও সমন্বিত আলোচনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে যাতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়।

তবে এই সমঝোতার ঘোষণার দিনই ওমানের আশ শিসাহ উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালীর প্রবেশমুখে একটি তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত প্রক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস নিশ্চিত করেছে। এই ধরনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচল এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই সাময়িক পথ চালুর মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি মিললেও পূর্ণাঙ্গ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কাঠামোগত বিরোধের অবসান ঘটানো জরুরি।

বিশ্লেষকরা বলছেন যে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখতে এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা কমাতে এই ধরনের আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের এই জলপথে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপদ বাণিজ্য নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে আরও নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে। আগামী দিনগুলোতে এই সাময়িক করিডোর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলাফল কী দাঁড়ায়, তা বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।

banner
Link copied!