মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্বে নতুন জটিলতার মুখে উপসাগরীয় দেশগুলো

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ২৫, ২০২৬, ১০:৫২ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্বে নতুন জটিলতার মুখে উপসাগরীয় দেশগুলো

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে সোমবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা ও রয়টার্স জানিয়েছে। গত প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই সংঘাতে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মার্কিন প্রশাসন এখন তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তীব্র করার কৌশল গ্রহণ করেছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সোমবার অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট নামক এই নতুন অর্থনৈতিক অভিযানের ঘোষণা দেন। এই পদক্ষেপে ইরানের অবশিষ্ট আর্থিক উৎসগুলো বন্ধ করার পাশাপাশি যারা তেহরানের সাথে ব্যবসা চালিয়ে যাবে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে ইরানের আর্থিক নেটওয়ার্ক এবং বাণিজ্যের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বেসেন্ট জানান যে বিশ্বের কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানই এই নিষেধাজ্ঞার সীমার বাইরে নয় এবং বিশ্বনেতাদের এখন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে। তবে এই ঘোষণায় উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এক কঠিন এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কারণে এই দেশগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা সুরক্ষা লাভ করলেও অন্যদিকে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই তাদের ভূখণ্ড ও অবকাঠামো ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ী এর আগে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছিলেন যে ইরানের আশপাশের কোনো দেশ যদি আমেরিকার এই অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেয়, তবে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে এক ফোঁটাও তেল রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়ে থাকে। যুদ্ধের শুরু থেকেই হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ থাকার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন অর্থনৈতিক চাপ তেহরানের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় আঞ্চলিক শক্তিগুলো কীভাবে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানামুখী আলোচনা চলছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি ইরানের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক হ্রাসের বা ছিন্ন করার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিলেও সৌদি আরব, কাতার এবং ওমানের মতো অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশ কিছুটা ভিন্ন। এই দেশগুলো তেহরানের সাথে কূটনৈতিক চ্যানেল সচল রাখার ওপর জোর দিচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর লক্ষ্যে যেকোনো কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান করছে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী ইরানের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে আলোচনার টেবিলে বসাতে বাধ্য করা সম্ভব হবে। তবে এই কৌশলের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা এসব দেশের জাতীয় উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের হুমকি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিগত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে অনুসৃত সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি পুরোপুরি সফল হয়নি। বর্তমান সংঘাতের শুরু থেকেই মার্কিন প্রশাসন অল্প সময়ে লক্ষ্য অর্জনের আশা করলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ওয়াশিংটন সামরিক পন্থার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অবরোধকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। তবে চীন, ভারত এবং রাশিয়ার মতো প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলো ওয়াশিংটনের এই নিষেধাজ্ঞাকে কীভাবে মোকাবিলা করবে, তার ওপর নির্ভর করবে এই কৌশলের প্রকৃত সাফল্য। ভারতের মতো দেশগুলো অতীতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানি তেল আমদানি বন্ধ রাখলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ দেখা যাচ্ছে।

চীন ইরানের তেল আমদানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে অবস্থান করছে এবং বেইজিং অতীতেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে তেহরানের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ওয়াশিংটন যদি প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদারদের ওপর মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে চায়, তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। অন্যদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এমন এক পরিস্থিতিতে অবস্থান করছে যেখানে তেহরানের সাথে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তাদের নিজেদের জ্বালানি রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ফলে ওয়াশিংটনের কৌশলগত পরিকল্পনা উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদের জন্য স্বস্তির চেয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের শেষ কোথায় হবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানামুখী পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। তেহরান তার অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে বিকল্প পথ ও ডিজিটাল সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আর্থিক নেটওয়ার্ক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতৃবৃন্দ এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কূটনৈতিক পদক্ষেপ পরিচালনা করছেন। আগামী দিনগুলোতে এই অর্থনৈতিক অবরোধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

banner
Link copied!