মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

ইরানের ওপর কঠোরতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ২৪, ২০২৬, ১১:১৩ পিএম

ইরানের ওপর কঠোরতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার তেহরানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের কঠোরতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সর্বাত্মক অবরোধ আরোপের নতুন পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন বলে আল জাজিরা এবং রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। চলমান সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এখন সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি আর্থিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করার নীতি গ্রহণ করেছে। এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের আর্থিক খাতের লাইফলাইনগুলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এই ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে এবং তেলের দাম গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পর কিছুটা ওঠানামা করছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পদক্ষেপকে অর্থনৈতিক ডি-ডে হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন যে যেসব দেশ বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান তেহরানের সাথে ব্যবসা চালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ব্যাংকিং খাত, তেল ক্রেতা ও শোধনাগার, শিপিং কোম্পানি, বন্দর এবং এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোকে এই নতুন দণ্ডাত্মক ব্যবস্থার আওতায় আনা হতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন যে এই ধরনের সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে পঙ্গু করে তুললেও রাজনৈতিক আচরণ পরিবর্তনে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

তেহরানের পক্ষ থেকে মার্কিন এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং অর্থনৈতিক সন্ত্রাস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে ওয়াশিংটন একতরফাভাবে অন্যান্য স্বাধীন দেশের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে যেসব আঞ্চলিক দেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সাথে যুক্ত হবে, তাদের তেহরানের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি রপ্তানি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই হুমকি নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।

গত ছয় মাস ধরে চলা এই সংঘাতের জেরে ইরানের অর্থনীতি ইতিমধ্যে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ এর প্রকৃত মূল্য পরিশোধ করছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তেহরান চীনসহ অন্যান্য মিত্র দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন সমন্বিত অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। বেইজিং ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কেমন হবে, তা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে নানামুখী আলোচনা চলছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে মার্কিন অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণা দুই দেশের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার এক নতুন ও জটিল অধ্যায়ের সূচনা করেছে। অতীতেও বহুবার তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপের নীতি প্রয়োগ করা হলেও দেশটি বিকল্প উপায়ে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল রপ্ত করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে চীন ইরানের বৃহত্তম তেল ক্রেতা হিসেবে দেশটির অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আগামী মাসে চীনা রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য ওয়াশিংটন সফরের আগে এই নিষেধাজ্ঞা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপথ এবং তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি এই নিষেধাজ্ঞার ফলে সাধারণ ইরানি নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মানবাধিকার কর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যাহত হওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি আকাশছোঁয়া হতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। ওয়াশিংটন দাবি করছে যে এই অর্থনৈতিক চাপ তেহরানকে নতুন করে আলোচনায় বসতে বাধ্য করবে, তবে তেহরান সরকারের পক্ষ থেকে নমনীয় হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যায়নি। বৈশ্বিক কূটনীতিতে এই স্নায়ুযুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেয়, তা আগামী দিনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে।

banner
Link copied!