সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

আলজেরিয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি চালু

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ২৪, ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম

আলজেরিয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি চালু

আলজেরিয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো ফরাসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা শিক্ষাদানের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা সোমবার নিশ্চিত করেছে। উত্তর আফ্রিকার এই দেশটির প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় ফরাসি ভাষার দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময়ের আধিপত্য হ্রাসের মাধ্যমে প্যারিসের সাথে সম্পর্কের বড় ধরনের ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ সেঘির সাদাউই সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি হবে একমাত্র বিদেশি ভাষা। এর ফলে ফরাসি ভাষার শিক্ষাদান চতুর্থ শ্রেণিতে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা ব্যবস্থার একটি বড় পরিবর্তন। আগামী মাস থেকে দেশজুড়ে আট বছর বয়সি শিশুরা ফরাসি শেখার আগেই ইংরেজি শিক্ষার মুখোমুখি হবে। রাষ্ট্রীয় এই নতুন রূপান্তরটি রাষ্ট্রপতি আবদেলমাজিদ তেবোউনের নির্দেশনায় প্রণীত দীর্ঘমেয়াদি ভাষাগত সংস্কারের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। দুই হাজার বাইশ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি চালুর ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে সরকার ক্রমান্বয়ে এই নীতি বাস্তবায়ন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশটির চিকিৎসা ও বিজ্ঞান অনুষদগুলোতেও ফরাসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা শুরু হয়েছে। কিছু সরকারি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল এবং এয়ার আলজেরির টিকিট থেকেও ফরাসি ভাষা সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা হয়েছে। বুফারিকসহ বিভিন্ন পৌরসভার নতুন রাস্তার সাইনবোর্ডগুলোতে এখন আরবি ও ইংরেজির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে, যেখানে ফরাসি ভাষার কোনো অস্তিত্ব রাখা হয়নি। সরকারি মন্ত্রীদের ওয়েবসাইটগুলোতেও ইংরেজির বিকল্প যুক্ত করা হয়েছে, যা দেশটির প্রশাসনিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ। আলজেরিয়ার দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ফরাসি থেকে ইংরেজিতে এই রূপান্তরটি অত্যন্ত ব্যাপক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। উনিশশো বাষ্পাটী সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুতর কূটনৈতিক সংকটের সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দুই হাজার চব্বিশ সালের জুলাই মাসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ মরক্কোর সাহারা অঞ্চলের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি প্রকাশ্যে সমর্থন করেন। সাহরাওয়াই পলিসারিও ফ্রন্টকে সমর্থনকারী এবং এক লক্ষ সত্তর হাজারেরও বেশি সাহরাওয়াই শরণার্থীকে আশ্রয়দানকারী আলজেরিয়া এই অবস্থানকে অত্যন্ত উসকানিমূলক হিসেবে দেখেছে। এই ঘটনা এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিরোধের জেরে দুই দেশই পারস্পরিক কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের বহিষ্কারের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কূটনৈতিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করার পরই আলজেরিয়ায় ফরাসি ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়াটি দ্রুততর হয়। মধ্যবিদ্যালয়ে দীর্ঘ ত্রিশ বছর ইংরেজি শিক্ষকতা করে অবসরপ্রাপ্ত ষাট বছর বয়সি আহমেদ ক্রিম এই সিদ্ধান্তকে একটি চমৎকার পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে এই বিশাল পরিবর্তনের সফল বাস্তবায়নের জন্য গভীর চিন্তা, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে। ঔপনিবেশিকতার দীর্ঘ ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের জাতীয় পরিচয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যম পুনর্নির্ধারণের এই প্রচেষ্টাকে বিশেষজ্ঞরা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। সমাজে ফরাসি ভাষার বহুমুখী উপস্থিতি এবং ঐতিহাসিক সংযোগের কারণে এই পরিবর্তনটি সহজ নয় বলে অনেকে মত প্রকাশ করেছেন। তা সত্ত্বেও বর্তমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় দেশটির প্রশাসন এই সংস্কার কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনড় রয়েছে। শিক্ষাখাতের এই আমূল পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে দেশটির তরুণ প্রজন্মের জন্য বৈশিক কর্মবাজার ও প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হওয়ার নতুন দ্বার উন্মুক্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শিক্ষা খাতের এই সংস্কার কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং উচ্চশিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ফরাসি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার এই নীতিটি আলজেরিয়ার তরুণ সমাজ এবং বুদ্ধিজীবী মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একদল নাগরিক একে ঔপনিবেশিক শাসনের মানসিক শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক হিসেবে দেখছেন, অন্য একটি অংশ রূপান্তর প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। দেশটির শিক্ষাবিদরা মনে করছেন যে ইংরেজি শিক্ষাদানের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং আধুনিক পাঠ্যপুস্তকের সরবরাহ নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। রাজধানী আলজিয়ার্সসহ প্রধান শহরগুলোতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো বর্তমানে দ্রুতগতিতে ইংরেজি শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। বিশ্বায়নের এই যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে তাল মেলাতে ইংরেজি ভাষার বিকল্প নেই বলে নীতি নির্ধারকরা বারবার উল্লেখ করে আসছেন। উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যেও ফরাসি ভাষার প্রভাব কমিয়ে আনার একটি সুপ্ত প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। আলজেরিয়ার এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত কেবল একটি ভাষার পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিগত ছয় দশকে দেশটির অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফরাসি সংস্কৃতির যে গভীর প্রভাব পড়েছিল, বর্তমান প্রশাসন তা থেকে মুক্ত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সাধারণ অভিভাবকদের মধ্যেও এই নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে এবং অনেকে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে ইংরেজি শিক্ষাকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। তবে মাঠপর্যায়ে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর না করলে এই মহাযজ্ঞ সফল করা কঠিন হতে পারে বলে অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের বাস্তবায়ন আলজেরিয়ার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বৈশ্বিক অঙ্গনে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন। শিক্ষা ব্যবস্থার এই রূপান্তর সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারলে তা অন্যান্য উত্তর আফ্রিকান দেশগুলোর জন্য একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। ফরাসি উপনিবেশের সুদীর্ঘ ইতিহাসকে পেছনে ফেলে আধুনিক বিশ্বে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে আলজেরিয়া যে পথ বেছে নিয়েছে, তার দূরবর্তী ফলাফল নির্ধারণ করবে দেশটির আগামী দিনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্য।

banner
Link copied!