আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি এক নতুন এবং গভীর সংকটে নিপতিত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখল ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টার কারণে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক ও ক্রমবর্ধমান নৃশংসতা এবং অবৈধ খনি খননের মতো অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ শোষণের ফলে দেশটির মানবিক সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
দুই হাজার একুশ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে জান্তা বাহিনী দেশজুড়ে বিমান হামলা, অগ্নিসংযোগ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সহায়তা প্রদানে বাধা দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক কৌশল প্রয়োগ করে আসছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এই সংঘাতের সূচনা থেকে এ পর্যন্ত অন্তত আট হাজার পঁচাত্তর জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে এক হাজার চুয়াত্তর জন শিশু রয়েছে। এমনকি বিগত এক বছরের মধ্যেই অন্তত এক হাজার দুইশ একচল্লিশ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তবে স্বাধীন উৎসগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী এই নিহতের সংখ্যা পনেরো হাজার সাতশ একত্রিশ পর্যন্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
চলমান এই সহিংসতা ও দমনপীড়নের ফলে দেশটির ভেতর অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে তিন দশমিক ছয় মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার চরম সংকটের কারণে প্রায় বারো দশমিক চার মিলিয়ন মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখোমুখি হচ্ছে এবং চার লক্ষাধিক শিশু ও প্রসূতি নারী মারাত্মক অপুষ্টির শিকার হচ্ছেন। দেশটির সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে সামরিক বাহিনীর সাথে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও স্থানীয় মিলিশিয়াদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান এই ভয়াবহ পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মিয়ানমারের যুদ্ধাপরাধ ও সম্পদ লুণ্ঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে গভীর আত্মমূল্যায়ন করার আহ্বান জানিয়েছে। সামরিক জান্তার পাশাপাশি স্থানীয় সংঘাতের সাথে জড়িত অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। অবিলম্বে সামরিক দমনপীড়ন বন্ধ করে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে দেশটির মানবিক সংকট আরও মারাত্মক রূপ নেবে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, কাচিন ও শান রাজ্যের মতো খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে অবৈধ বিরল মৃত্তিকা ধাতু উত্তোলনের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অবৈধ খনি ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত অর্থ সংঘাতের ব্যয় নির্বাহ করতে এবং অপরাধী চক্রগুলোকে মদদ জোগাতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য স্থানীয় জলবায়ু ও নদী ব্যবস্থাকে দূষিত করায় লাখ লাখ গ্রামীণ মানুষের জীবন ও জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও চরম অনিশ্চয়তা ও খাদ্য সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে অবস্থানরত শরণার্থীরা তাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় চলমান আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপ আরও জোরালো না করা হলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান অসম্ভব বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
