শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩

ফ্রেন্ডস সিরিজের মতো নতুন সিরিজ নির্মাণ করতে ব্যর্থ নির্মাতারা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ২৮, ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

ফ্রেন্ডস সিরিজের মতো নতুন সিরিজ নির্মাণ করতে ব্যর্থ নির্মাতারা

বিবিসি নিউজ-এর একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান প্রজন্মের দর্শকদের জন্য নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় সিটকম ‍‍`ফ্রেন্ডস‍‍`-এর সমকক্ষ কোনো টেলিভিশন সিরিজ তৈরি করা নির্মাতাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মূল সিরিজটি ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী দর্শকদের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করলেও, বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের জন্য একই ধরনের সফল সিরিজ নির্মাণের প্রচেষ্টাগুলো ক্রমাগত ব্যর্থ হচ্ছে। ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সম্প্রচারিত ফ্রেন্ডস সিরিজের প্রতিটি পর্ব গড়ে দুই কোটির বেশি দর্শক উপভোগ করতেন এবং এর শেষ পর্বটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় পাঁচ কোটি পঁচিশ লাখ দর্শক দেখেছিলেন। আর্থিক ও দর্শকসংখ্যার পাশাপাশি ফ্রেন্ডস সিরিজটি সংস্কৃতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল, যার বিভিন্ন সংলাপ বা চরিত্রগুলোর পোশাকের ধরন দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত হয়েছিল। ইউসিএলএ-এর সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও এই পুরোনো সিরিজটি ব্যাপক জনপ্রিয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বড় শহরগুলোতে বসবাসকারী তরুণদের জীবনযাত্রা নিয়ে বেশ কিছু নতুন টেলিভিশন প্রজেক্ট তৈরি করা হয়েছে। নট সুটেবল ফর ওয়ার্ক, অ্যাডাল্টস, দ্য সেক্স লাইভস অব কলেজ গার্লস এবং আই লাভ এলএ-এর মতো সিরিজগুলো নির্মিত হলেও সেগুলো পুরোনো সেই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। মিডিয়া বিশ্লেষকরা এর প্রধান কারণ হিসেবে টেলিভিশন জগতের ব্যাপক পরিবর্তনকে দায়ী করছেন। ২০২৬ সালের একটি মিডিয়া আউটলুক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান প্রজন্মের শতকরা ৪৩ ভাগ দর্শক প্রথাগত টেলিভিশন বা পেইড স্ট্রিমিং সার্ভিসের বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলো বেশি পছন্দ করেন। আধুনিক সিরিজগুলোর কাঠামোগত দিকটিও দর্শক ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। আগের দিনে সম্প্রচারিত সিরিজগুলোতে প্রতিটি মৌসুমে ২০টির বেশি পর্ব থাকলেও, বর্তমানে তা কমে মাত্র আট থেকে দশটি পর্বে দাঁড়িয়েছে, যা চরিত্রগুলোর সাথে দর্শকদের মানসিক সংযোগ তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়।

বর্তমান প্রজন্মের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সিরিজ নির্মাতাদের চিন্তাধারার মধ্যে ব্যবধান আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। শিল্প বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ সিরিজের রচয়িতারা বয়স্ক প্রজন্মের হওয়ায় তারা বর্তমান সময়ের সামাজিক পরিস্থিতি বা তরুণদের ভাষা সঠিকভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এছাড়া দর্শকদের বৈচিত্র্যও একটি বড় প্রভাব ফেলছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান তরুণ সমাজ ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি জাতিগত ও বর্ণগত বৈচিত্র্য ধারণ করে। পূর্বের টেলিভিশন সিরিজগুলোতে যে ধরনের একক সামাজিক গোষ্ঠীর চিত্রায়ন করা হতো, তা বর্তমান সময়ে ছোট একটি চরিত্রের দলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিনোদনমূলক টেলিভিশন সিরিজ নির্মাণের পথকে জটিল করে তুলেছে। বর্তমান সময়ের তরুণরা বেকারত্বের উচ্চ হার, কাজের সুযোগ কমে যাওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এই হতাশাজনক পেশাগত বাস্তবতার সাথে সিটকমের স্বাভাবিক হাস্যরস মেলানোর চেষ্টা প্রায়শই দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায়।

ইন্টারনেট সংস্কৃতির ব্যাপক বিস্তার আধুনিক চিত্রনাট্যকারদের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় ডিজিটাল জীবনযাত্রা এবং স্মার্টফোনের ব্যবহার স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তোলা দৃশ্যগতভাবে বেশ কঠিন। যে সিরিজগুলো অনলাইন জীবনের প্রভাব তুলে ধরার চেষ্টা করে, সেগুলোও অনেক সময় বাস্তব ও ডিজিটাল জগতের পার্থক্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হয়। মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দর্শকদের খণ্ডিত অভ্যাসের কারণে পুরো একটি প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী একক কোনো সিরিজ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত ক্ষীণ।

banner
Link copied!