বেন শাপিরোর নতুন চলচ্চিত্র ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থীদের গাজা সংহতি আন্দোলনকে সন্ত্রাসবাদের মোড়কে উপস্থাপন করে নতুন করে ইসলামবিদ্বেষ উসকে দিচ্ছে বলে আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে অভিযোগ করা হয়েছে। ডেইলি ওয়্যার নামক সংবাদমাধ্যমের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং কট্টর ডানপন্থি হিসেবে পরিচিত শাপিরো সম্প্রতি রান হাইড ফাইট ইনফিডেলস নামের এই চলচ্চিত্রের ট্রেলার প্রকাশ করেছেন। শাপিরো দাবি করেছেন যে গত তিন দশক ধরে হলিউড কট্টরপন্থি ইসলামের ঝুঁকির বিষয়টি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছে। তবে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা কেয়ারের যোগাযোগ ব্যবস্থাপক এনজি এল-কাদি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে ছবিটিকে হলিউডের দীর্ঘদিনের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার নতুন সংস্করণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
হলিউড কয়েক দশক ধরেই আরব এবং মুসলিমদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে আসছে। জ্যাক শাহিন ২০০৩ সালে প্রকাশিত তার রিল ব্যাড আরব্স নামক বইয়ে প্রায় নয়শ চলচ্চিত্রের বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন যে হলিউড ধারাবাহিকভাবে মুসলিমদের সহিংস এবং হুমকিস্বরূপ হিসেবে তুলে ধরেছে। ট্রু লাইজ, এক্সিকিউটিভ ডিসিশন, দ্য সিজ এবং রুলস অব এনগেজমেন্ট এর মতো চলচ্চিত্রগুলোতে মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০১৫ সালে আমেরিকান স্নাইপার মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। একইভাবে টুয়েন্টি ফোর এবং হোমল্যান্ড এর মতো টেলিভিশন ধারাবাহিকগুলোতেও মুসলিম সম্প্রদায়কে চরমপন্থি হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নতুন এই চলচ্চিত্রের ট্রেলারে দেখানো হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ইসলামি সন্ত্রাসীদের দখলে চলে গেছে। সেখানে গাজা সংহতি শিবিরের আদলে একটি কাল্পনিক খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি নাইন ইলেভেন এবং ইসলামিক স্টেট বা আইএসআইএল এর ছবি ও ভিডিওর সঙ্গে ২০২৪ সালের সাধারণ শিক্ষার্থীদের গাজা বিক্ষোভের দৃশ্য জুড়ে দিয়ে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনকে চরমপন্থি সহিংসতার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাসী হিসেবে প্রমাণের এটি একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা।
এই ধরনের বিদ্বেষমূলক প্রচারণার বাস্তব পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগোতে অবস্থিত একটি ইসলামি কেন্দ্রে ইসলামবিদ্বেষী চরমপন্থিরা হামলা চালিয়েছিল। সেই হামলায় শিশুদের রক্ষা করতে গিয়ে তিনজন ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, দশকের পর দশক ধরে মুসলিম এবং আরবদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করার কারণেই এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে।
চলচ্চিত্রটি এমন এক সময়ে প্রচার করা হচ্ছে যখন বিশ্বজুড়ে ইসলামবিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাজায় চলমান সামরিক আগ্রাসন থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে এবং আসন্ন মার্কিন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতেই এই ধরনের প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। গত বছরের সাত অক্টোবরের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ফিলিস্তিনি, মুসলিম এবং তাদের মিত্রদের প্রতিনিয়ত নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রামি বা মিস মার্ভেল এর মতো কিছু সাম্প্রতিক ধারাবাহিকে মুসলিমদের কিছুটা বৈচিত্র্যময়ভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হলেও, বেন শাপিরো এখন সেই পুরোনো ইসলামবিদ্বেষী ধারাটিকেই নতুন মোড়কে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। যা এখনও স্পষ্ট নয় তা হলো সাধারণ দর্শক হলিউডের এই পুরোনো বিদ্বেষমূলক ধারাকে কীভাবে গ্রহণ করবেন।
