মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতি তাঁর আকস্মিক কূটনৈতিক মনোভাব পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোতে গভীর অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ইউনিভার্সিটি অব অ্যালবার্টার গবেষক ওয়েনরং জিয়াং উল্লেখ করেছেন যে, ট্রাম্পের এই লেনদেনভিত্তিক বৈদেশিক নীতি মার্কিন নিরাপত্তার নিশ্চয়তার ওপর দীর্ঘদিনের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোকে নতুন করে তাদের কৌশল নির্ধারণে বাধ্য করছে।
মধ্য আগস্টে নির্ধারিত এগারো দিনের উলচি ফ্রিডম শিল্ড সামরিক মহড়া কমিয়ে পাঁচ দিনে নামিয়ে আনতে পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের প্রতি শুভেচ্ছা স্বরূপ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন যে, ওয়াশিংটন যখন বৈশ্বিক নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখছে, তখন মিত্র দেশগুলো মার্কিন স্বার্থের সব ক্ষেত্রে পাশে থাকছে না। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে দক্ষিণ কোরিয়ার অংশ না নেওয়ার বিষয়টি মার্কিন রাষ্ট্রনায়কদের এই ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে পিয়ংইয়ংয়ের পক্ষ থেকে এই মার্কিন পদবী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়েছে। কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা আংশিক স্বীকার করলেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তর কোরিয়াকে একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে হবে। পাশাপাশি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের শত্রুভাবাপন্ন নীতি পরিহার না করলে কোনো ফলপ্রসূ সংলাপ সম্ভব নয় বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ পরমাণু অস্ত্রত্যাগের যে দাবি জানানো হয়ে থাকে, তার সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের এই অনমনীয় অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে।
অন্যদিকে চীনের প্রতিক্রিয়া কিছুটা সংযত হলেও তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি সিউল সফরকালে দক্ষিণ কোরিয়াকে কোনো বিশেষ ব্লকের পক্ষ না নিয়ে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং এখন কোরীয় উপদ্বীপে কঠোর পরমাণু অস্ত্র বাতিলের পুরনো দাবির পরিবর্তে দুই পৃথক রাষ্ট্রের বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাম্প্রতিক যৌথ বিবৃতিগুলোতেও পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত শব্দ চয়নের অনুপস্থিতি এই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত বহন করে।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জাপানও তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে টোকিও জাতীয় গোয়েন্দা ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করেছে এবং দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। জাপানের এই দ্রুত সামরিকীকরণের পদক্ষেপ পিয়ংইয়ংয়ের তীব্র ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেইজিংয়ের মূল উদ্বেগ হলো, মার্কিন নিরাপত্তার নিশ্চয়তার অনুপস্থিতিতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে জাপানের পুনরুত্থান পুরো আঞ্চলিক ভারসাম্যে নতুন বিপদের সৃষ্টি করতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়াও বর্তমান পরিস্থিতিতে বসে নেই। মার্কিন অনিশ্চয়তার মুখে দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে যুদ্ধকালীন অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার এবং পারমাণবিক চালিত সাবমেরিন নির্মাণের পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করেছেন। ওয়াশিংটনের খামখেয়ালি আচরণ, বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং টোকিওর সামরিক প্রস্তুতির ত্রিমুখী চাপে পড়ে সিউল এখন এক জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
আসন্ন নভেম্বরের এপেকের শীর্ষ সম্মেলন এই নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের প্রথম বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক সম্পর্কের এই পালাবদলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুরোনো নিরাপত্তা জোট দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো স্বাধীনভাবে তাদের নিজস্ব অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পূর্ব এশিয়া এমন এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে চলেছে যেখানে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র প্রভাব ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিজেদের মতো করে ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরি করছে।
