ইয়েমেনের তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে দেশটির অবরুদ্ধ তাইজ শহরের একটি হাসপাতালের সচল ইনকিউবেটরের সংখ্যা চল্লিশটি থেকে কমিয়ে মাত্র দশটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে নবজাতক শিশুরা চরম ও তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র লড়াইয়ের কারণে জীবন রক্ষাকারী সব ধরনের সরবরাহ প্রায় বন্ধ রয়েছে, যা এই অঞ্চলের লাখ লাখ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মাতৃত্ব ও শিশুকল্যাণ বিষয়ক ইয়েমেনি-সুইডিশ হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডের সেবিকা নাদা আহমেদ সাংবাদিকদের কাছে সেখানকার ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন।
তিনি জানান, শিশুদের উষ্ণ রাখার বা ইনকিউবেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও জ্বালানি কোনোটাই তাদের হাতে নেই।
একই ওয়ার্ডের তত্ত্বাবধায়ক নাওয়াল নাজিব সতর্ক করে বলেছেন যে, শিগগিরই নতুন জ্বালানি সরবরাহ না পৌঁছালে হাসপাতালটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
নাজিব উল্লেখ করেন যে, এটি শিশুদের জন্য একটি বিশাল বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং এর পরিণতি হবে মৃত্যু ও স্থায়ী অক্ষমতা।
গত ৩ অক্টোবর থেকে তাইজ শহরটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। সরকারি বাহিনী ও হুথি আন্দোলনের মধ্যে সংঘর্ষের পর থেকে সাধারণ মানুষের শহর ছাড়ার এবং মানবিক সহায়তা ঢোকার পথ বন্ধ রয়েছে।
হুথি বাহিনী তাইজ-আদেন করিডোরসহ প্রধান সরবরাহ রুটগুলো বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে খাদ্য, পানি ও জ্বালানির সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে বাস্তুচ্যুত আড়াই লাখ মানুষের প্রায় অর্ধেকই এখন এই শহরে অবস্থান করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেইয়ার জানিয়েছেন যে, তাইজ শহরের ভেতরের বতাল্লিশটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র তীব্র জ্বালানি, অক্সিজেন, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
চালক আব্দুল্লাহ আল-রাদফানি জানান, জ্বালানির দাম হু হু করে বেড়ে প্রতি লিটার দুই হাজার ইয়েমেনি রিয়ালে দাঁড়িয়েছে।
অক্সফ্যাম ইয়েমেনের নীতি ও গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক ফাতেমা জাফফার শতাহ ব্যাখ্যা করেন যে, জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। তিনি একজন ডায়ালাইসিস রোগীর উদাহরণ টেনে বলেন যে, যাতায়াত খরচ আধা ডলার থেকে প্রায় দশ ডলারে বেড়ে যাওয়ায় ওই রোগীকে এখন দুই সেশনের মাঝখানে বাড়ি না গিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই দুই রাত কাটাতে হচ্ছে।
এই সংকটের প্রভাব শুধু তাইজে সীমাবদ্ধ নেই। ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স জানিয়েছে যে, জ্বালানি সংকটের কারণে দক্ষিণাঞ্চলীয় আদেন ও লাহিয প্রদেশের হাসপাতাল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে, যার ফলে অপারেশন থিয়েটার ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলো মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা গোষ্ঠীগুলোও ক্রমবর্ধমান ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতা নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে যে, তাইজ ও এর আশেপাশের এলাকার আট লাখেরও বেশি মানুষ খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
ইউনিসেফের মুখপাত্র রিকার্ডো পাইরেস জানিয়েছেন যে, চলতি বছর তাইজে স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতায় আসা এক লাখ ৬৮ হাজার শিশুর মধ্যে ৫২ হাজার শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, যার মধ্যে সাড়ে ১১ হাজারের বেশি শিশু মারাত্মক তীব্র পুষ্টিহীনতার শিকার।
প্রায় তিন মাস ধরে চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইউনিসেফ প্রায় আট হাজার কার্টন থেরাপিউটিক খাবার প্রস্তুত রেখেছে। তবে পাইরেস সতর্ক করেছেন যে, ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা এবং চলাচল সীমিত থাকার কারণে ভবিষ্যৎ সহায়তা পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং পরিবারগুলোর পক্ষে ক্লিনিকে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।
ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স জানিয়েছে যে, উত্তর ও পশ্চিম উপকূলের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পরিবারগুলো পালিয়ে আসায় দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে শিশুদের পুষ্টিহীনতা পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ অক্টোবরের মধ্যে এই সহায়তা সংস্থাটি আদেন ও লাহিযের ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিকে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৯৯ জন শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৪৪ জন শিশু বা ১৪.৭ শতাংশ মাঝারি পুষ্টিহীনতায় এবং ২৮ জন শিশু বা ৯.৪ শতাংশ মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, যাদের হাসপাতালের সেবা প্রয়োজন।
সংস্থার ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক সারা ঘানেম জানান যে, তারা প্রতিদিন যে অঞ্চলেই যান না কেন, অন্তত এক বা দুজন করে মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুর দেখা পান।
