গাজার একটি জনবহুল বাস্তুচ্যুত শিবিরের তাঁবুর ওপর মঙ্গলবার সমুদ্রের বাতাসে ঘুরছিল স্ক্র্যাপ মেটাল দিয়ে তৈরি দেশীয় উইন্ড টারবাইন। অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের জীবনে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিচ্ছে এই টারবাইনগুলো।
দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস শিবিরে এই উদ্ভাবনী কাজ শুরু করেছেন কামাল আল-দাবারি। উপত্যকার ধ্বংসপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যাদের কোনো সংযোগ নেই, এমন পরিবারগুলোর উপকারে আসছে তাঁর এই উদ্যোগ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে গাজার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসরায়েলি হামলায় আবাসিক বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মাটিতে বসে একটি প্লাস্টিকের টেবিলের ওপর বৈদ্যুতিক তার ও ধাতব যন্ত্রাংশ নিয়ে কাজ করছিলেন দাবারি। খুব সতর্কতার সঙ্গে ক্যাবলগুলো পেঁচিয়ে মাল্টিমিটার দিয়ে পরীক্ষা করার পর একটি ছোট বাল্ব জ্বলে ওঠে, যা বিদ্যুৎ প্রবাহের ইঙ্গিত দেয়।
সোলার প্যানেলের দাম যখন তুলনামূলক নাগালে ছিল, তখন ষাটোর্ধ্ব এই ব্যক্তি একটি সোলার প্যানেল কিনেছিলেন এবং রোদের সঙ্গে মিল রেখে তা এদিক-সেদিক সরিয়ে নিতেন। ফিলিস্তিন ইসলামি আন্দোলনের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর চালানো হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়।
তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধের পর ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত দিয়ে ত্রাণ ও বাণিজ্যিক সরবরাহ কমে যাওয়ায় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। বর্তমানে একটিমাত্র সোলার প্যানেলের দাম কমপক্ষে ১৫ হাজার শেকেল বা প্রায় পাঁচ হাজার ডলার, যা অধিকাংশ গাজাবাসীর সামর্থ্যের বাইরে।
সাবেক এই প্রকৌশল শিক্ষার্থী জানান, গত তিন বছর ধরে তাদের কোনো কাজ বা আয় নেই। তখনই উইন্ড টারবাইন তৈরির ভাবনা তার মাথায় আসে এবং তিনি ভাবেন ধ্বংসস্তূপ থেকে যন্ত্রাংশ কুড়িয়ে কেন বাতাসকে কাজে লাগানো যাবে না।
স্কুটারের মোটর এবং কেটে ফেলা পুরোনো পানির ট্যাংকের ব্লেড দিয়ে এই টারবাইনগুলো তৈরি করা হচ্ছে। বাতাস যখন ব্লেডগুলোকে ঘোরায়, তখন তা একটি মোটর চালিত করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। এরপর ধ্বংস হওয়া বাড়িঘর থেকে সংগ্রহ করা যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি সার্কিটের মাধ্যমে সেই বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা হয়।
এর ফলে মোবাইল চার্জ দেওয়া, বাতি, পাখা এমনকি শেভিং মেশিন চালানোর মতো যথেষ্ট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। তাঁবুতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর কাছে এই ছোট স্বস্তিগুলো এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের সময় গাজার প্রায় সব বাসিন্দা অন্তত একবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং বেশিরভাগ মানুষ এখন হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি ছোট এলাকায় বসবাস করছেন, আর ইসরায়েল সীমান্ত বরাবর ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে।
স্থানীয়ভাবে আবু আয়মান নামে পরিচিত দাবারি বলেন, মহান আল্লাহ এই বিপদ থেকে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত এবং তারা বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বাসিন্দাদের টিকে থাকতে সাহায্য করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত, তবে তীব্র সংকটপূর্ণ একটি শিবিরে প্রতিটি ওয়াটই অত্যন্ত মূল্যবান।
সালেহ বেন হাসান জানান, এই ব্যবস্থা তাদের সবকিছু বদলে দিয়েছে। গাজায় স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ পাওয়া যখন অত্যন্ত কঠিন, তখন এই বিদ্যুৎ চিকিৎসাসামগ্রী সচল রাখতেও সহায়তা করছে।
বেন হাসান বলেন, গভীর রাতে কোনো শিশুর যদি নেবুলাইজার মেশিনের প্রয়োজন হয়, তবে তারা কার কাছে যাবে? বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলে তারা তাদের ভাই আবু আয়মানের শরণাপন্ন হন।
