গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিন সন্তানের জননী ও শিল্পী মাইসা ইউসেফ তাঁর স্বামীকে মধ্য গাজার একটি বাজারে পাঠান ছুটির দিনের কিছু খাবার কেনার জন্য। তবে তিনি প্রায় খালি হাতেই ফিরে আসেন। অবরুদ্ধ এই উপত্যকায় কেনাকাটা এখন এক অনিশ্চিত ও কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ফ্রিজ না থাকায় তাঁর পরিবার আগেভাগে খাবার কিনে রাখতে পারে না। অথচ সন্ধ্যার দিকে বাজারে গেলে খাঁ খাঁ করে তাক। স্বামী যখন বাজার থেকে ফোন করেন, তখন মাইসা তাঁকে মুজাদ্দরা রান্না করার পরামর্শ দেন। কিন্তু স্বামী জানান, বাজারে চাল বা ডাল কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তাঁর পরিবার এখন রান্নাঘরের ক্যাবিনেটে যা সামান্য জমানো আছে, তার ওপরই নির্ভর করছে।
মাইসা পরিবারের এই সংগ্রাম পুরো অবরুদ্ধ উপত্যকার ভয়াবহ খাদ্য সংকটেরই একটি খণ্ডচিত্র। ময়দা ও মৌলিক খাদ্যপণ্যের ঘাটতির কারণে চালু থাকা বাকি বেকারিগুলোও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, অন্যদিকে বাসিন্দারা তাদের শেষ সম্বলটুকুও ফুরিয়ে ফেলেছেন। মানবিক সাহায্য ও বাণিজ্যিক পণ্যের প্রবেশে ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘদিনের কড়াকড়ির কারণে ২০২৫ সালে দেখা দেওয়া দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি ফিরে আসার ভয় আরও তীব্র হয়েছে। ইউরো-মেডিটেরিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরের মাঠকর্মীরা স্থানীয় বাজারগুলো পরিদর্শন করে ফলমূল, শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখতে পেয়েছেন। অবরোধ এবং বারবার বাস্তুচ্যুতির কারণে সাধারণ মানুষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অবশিষ্ট খাবারের বেশিরভাগই তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
রুটি উৎপাদনও এখন সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছে। গুদামের ময়দার মজুদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে ডেলিভারি আবার শুরু না হলে গাজায় বর্তমানে চালু থাকা সাতটি বেকারি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। গাজা বেকারি অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান আবদুল নাসের আল-আজরামি এই সংকটের জন্য গত এক সপ্তাহ ধরে সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ রাখা এবং বাণিজ্যিক ময়দা প্রবেশে ইসরায়েলের বাধাকে দায়ী করেছেন। ফিলিস্তিনের সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-আজরামি জানান, কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আটকে রেখেছেন এবং পুরনো পণ্য চড়া দামে বিক্রি করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক দামের কথা জানিয়েছেন। বিগত দুর্ভিক্ষের সময় যে ৫০ কেজি ময়দার বস্তার দাম ছিল ২০০ শেকেল, এখন তার জন্য অনেক বেশি দাম গুনতে হচ্ছে। এ ছাড়া সামান্য কিছু আলুর দাম আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে গেছে। এক ট্রে ডিমের দাম ১৭ শেকেল থেকে বেড়ে প্রায় ১৫০ শেকেলে দাঁড়িয়েছে। মাংসের দাম যেমন আকাশচুম্বী, তেমনি তা দুর্লভ এবং প্রায়শই নিম্নমানের। মাইসা ইউসেফ জানান, বাজারে প্রতি কেজি মাংসের দাম এখন ৭০ শেকেলে পৌঁছেছে, যা আগের দামের প্রায় দ্বিগুণ এবং সেই মাংস দেখতেও কালচে ও পুরনো।
বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ বন্ধ থাকার জন্য ফিলিস্তি ব্যবসায়ী ও হামাসের মধ্যকার বিরোধকে দায়ী করছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। বেসামরিক বিষয়গুলো সমন্বয়কারী ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট জানিয়েছে, প্রতি ট্রাকে হামাসের নির্ধারিত ১০,০০০ শেকেল কর এবং বিক্রির ৩০ শতাংশ নগদ লেনদেনের শর্তের প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা পণ্য সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন। তবে হামাস এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, এই অর্থ এতিম ও বিধবাদের সহায়তার জন্য একটি স্বেচ্ছামূলক অনুদান। গাজার বেসরকারি ট্রাকচালক ইউনিয়নের প্রধান নাহেদ শেহাইবারও ইসরায়েলি এই ব্যাখ্যা অস্বীকার করে বলেন যে ব্যবসায়ীরা সরবরাহ বন্ধ করেননি এবং এর জন্য ইসরায়েলি বাধাই দায়ী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রতিশ্রুত পণ্যগুলো প্রবেশের অনুমতি পেলে এই সংকট কিছুটা কমবে।
বাণিজ্যিক সরবরাহের পাশাপাশি মানবিক সহায়তার পরিমাণও দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। গত ১৯ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ঘোষণা করে যে তহবিল সংকটের কারণে তারা গাজায় খাদ্য সহায়তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে পাঁচ লাখ মানুষ জরুরি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আনুমানিক চৌদ্দ লাখ মানুষ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ, তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি রয়েছেন। যদিও এটি ২০২৫ সালের শেষের দিকের ষোল লাখ মানুষের তুলনায় কিছুটা কম, তবুও প্রায় দুই লাখ মানুষ এখনও এমন জরুরি পর্যায়ে রয়েছে যাদের অবিলম্বে সহায়তা প্রয়োজন।
উপত্যকার ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ বেকার এবং প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ সম্পূর্ণভাবে মানবিক খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। গণরান্নাঘরগুলোও চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। তহবিল স্বল্পতার কারণে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে যেখানে প্রতিদিন ছয় লাখ পঁচানব্বই হাজার পিস রান্না করা খাবার তৈরি হতো, অক্টোবরের শুরুতে তা কমে ছয় লাখ চৌদ্দ হাজারে নেমে আসে। জাতিসংঘ মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় জানিয়েছে, এখন কিছু এলাকায় মানুষ প্রতি দুই দিনে মাত্র একবার খাবার পাচ্ছে।
খাদ্য পর্যবেক্ষণের উপাত্তগুলো সাধারণ পরিবারের ওপর নেমে আসা এই দুর্যোগের চিত্রই তুলে ধরে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সেপ্টেম্বর মাসের জরিপ অনুযায়ী, ৪৪ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে যে তাদের সদস্যরা ৩০ দিনের মধ্যে অন্তত একবার ক্ষুধার্ত পেটে ঘুমাতে গেছে এবং ৪৫ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে তাদের খাবার সম্পূর্ণ ফুরিয়ে গিয়েছিল। প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে মাত্র একটি শিশু পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং প্রায় তিন হাজার ছোট শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে।
