গত এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর দেশটিতে হামলা কিছুটা কমলেও যুদ্ধের আওয়াজ পুরোপুরি থেমেনি। লেবাননের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, আকাশে ড্রোনের আনাগোনা এবং দূরের বিস্ফোরণের শব্দ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং মানুষ এসব শব্দের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ২০২৪ সালের পর থেকে তৃতীয় দফায় ইসরায়েলি হামলা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে এর আগে তীব্র ইসরায়েলি হামলা হয়েছিল, সেখানকার মানুষ এক অনিশ্চিত ও ঝুলন্ত অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
আয়া নামের এক নারী জানান, নতুন সংঘাত শুরু হলে যেন কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য তার পরিবার দাদা-দাদির জন্য অতিরিক্ত ওষুধ মজুত করে রেখেছে। অন্যরা হামলার আশঙ্কায় ব্যাগ গুছিয়ে রাখছেন, অতিরিক্ত খাবার সংগ্রহ করছেন এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো সব সময় চার্জ দিয়ে রাখছেন। তিনি যোগ করেন, এবার ইসরায়েলি হামলা জোরালো হলে তিনি আগের মতো আর ঘরে বসে থাকবেন না, বরং বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন।
তিনি হতাশার সুরে বলেন, তার আর এই ধকল সইবার শক্তি নেই। তিনি বরং লেবানন ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তিনি বলেন, আরেকটি বাস্তুচ্যুতির কষ্ট সহ্য করার মানসিকতা তার নেই, বিশেষ করে যখন দেখেন চারপাশের মানুষ কোনো কিছু না ঘটার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। তিনি বোঝেন যে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু তার নিজের জন্য এটি মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর।
লেবাননের শিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকেই যুদ্ধ চলছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যার সিংহভাগই ঘটে ২০২৪ সালের শরৎকালে এবং ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসের আগ্রাসনে। প্রতিটি অভিযানের সময় ইসরায়েল লেবাননে সৈন্য পাঠায় এবং এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা দখল করে রেখেছে, যেখানে হলুদ রেখা তৈরি করে তারা এখনো গ্রাম ও জনপদ ধ্বংস করে চলেছে।
গত এপ্রিল মাসে ইসরায়েল ১০ মিনিটেরও কম সময়ে লেবাননে শতাধিক হামলা চালিয়ে সাড়ে তিনশতের বেশি মানুষ হত্যার ঠিক এক সপ্তাহের বেশি সময় পর যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। এরপর জুন মাসে বৈরুত ও তেল আবিব মার্কিন মধ্যস্থতায় পাইলট অঞ্চল গঠনের একটি কাঠামোগত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে ওই অঞ্চলগুলো থেকে সরে যেতে হবে যাতে লেবাননীয় সেনাবাহিনী সেখানে প্রবেশ করে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে পারে।
ইসরায়েলের চলমান হামলা এবং সুদূর দক্ষিণাঞ্চলে ঘরবাড়ি ধ্বংস সত্ত্বেও সরাসরি যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত রয়েছে। যারা হলুদ রেখার ওপরে বসবাস করছেন, তারা মূলত প্রত্যক্ষ সংঘাতের বাইরে থাকলেও প্রতিনিয়ত বিস্ফোরণ ও ড্রোনের শব্দ শুনতে পান। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের ওপর আরেকটি আক্রমণ চালানোর কথা বিবেচনা করছেন বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক প্রতিশোধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং প্রশ্ন উঠেছে যে হিজবুল্লাহ আবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করবে কি না।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দেশটির সঙ্গে হওয়া কাঠামোগত চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে লেবাননের সেনাবাহিনী ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করলেও লেবানন তা অস্বীকার করেছে। লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহামাদ বাজজি বলেন, ইসরায়েল প্রমাণ করেছে যে তারা দক্ষিণ লেবাননকে যতটা সম্ভব ধ্বংস করতে এবং শিয়া সম্প্রদায়কে শাস্তি দিতে প্রস্তুত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি বড় পরিসরে ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করে, তবে ইসরায়েল যে একই কাজ আবার করবে না, তার কোনো কারণ নেই।
বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর হারেত হ্রেইকে থাকেন রামেজ। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তার অ্যাপার্টমেন্টের পাশের একটি ভবন ধসে পড়ার পর থেকেই তিনি তার পরিবারের দ্বিতীয় বাড়িতে থাকছেন। তিনি বলেন, তার কাছে এই যুদ্ধ কখনো শেষই হয়নি। তিনি তার ব্যাটারি ও পাওয়ার ব্যাংক সবসময় চার্জ রাখেন, কয়েক মাসের জন্য পানির সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন এবং গাড়ির ফুসট্যাংক সবসময় পূর্ণ রাখেন। দাহিয়া ও দক্ষিণাঞ্চলের অন্য বাসিন্দারাও জানান যে তারা জরুরি থলে প্রস্তুত রেখেছেন এবং নিরাপদে পালানোর পথগুলো আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছেন।
যুদ্ধের নতুন আরেকটি ধাপের আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে সাধারণ আতঙ্ক বিরাজ করার পাশাপাশি তারা অর্থনৈতিক চাপের মুখেও পড়েছেন। বিশ্বব্যাংক গত আগস্টে জানিয়েছে যে চলতি বছর লেবাননে মূল্যস্ফীতি ১৭ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর ফলে মারাত্মক নিরাপত্তা সংকট তৈরি হতে পারে এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
