যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক লড়াই এবার জ্বালানি খাতের গভীর সংকটে মোড় নিয়েছে। ইরানের কাছ থেকে তেল আমদানির অভিযোগে পাঁচটি চীনা তেল শোধনাগারের ওপর মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে রুখে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং। গত শনিবার চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ `প্রতিরোধমূলক আদেশ` বা ইনজাংশন জারি করেছে। এই আদেশের মাধ্যমে চীনের অভ্যন্তরীণ কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি মার্কিন ওই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে বা কার্যকর করতে বাধ্য থাকবে না। বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপ মূলত ওয়াশিংটনের একতরফা শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে একটি আইনি ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞাগুলো আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক রীতিনীতিকে লঙ্ঘন করে। বেইজিং মনে করে, এই পদক্ষেপগুলো তৃতীয় কোনো দেশের সাথে চীনা উদ্যোগগুলোর স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লেনদেনকে অন্যায়ভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের স্বার্থ রক্ষার্থেই চীন এই `প্রতিরোধ আদেশ` জারি করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। চীনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো একতরফা নিষেধাজ্ঞা বেইজিং কখনোই মেনে নেবে না।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা শোধনাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ডালিয়ান ভিত্তিক হেনগলি পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি। এছাড়া তালিকায় রয়েছে আরও চারটি তথাকথিত `টিপট` বা স্বতন্ত্র ও ছোট আকারের শোধনাগার— শানডং জিনচেং পেট্রোকেমিক্যাল গ্রুপ, হেবেই সিনহাই কেমিক্যাল গ্রুপ, শৌগুয়াং লুকিং পেট্রোকেমিক্যাল এবং শানডং শেংক্সিং কেমিক্যাল। গত ২৪ এপ্রিল মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ দাবি করেছিল যে, হেনগলি পেট্রোকেমিক্যাল ইরানের তেলের অন্যতম প্রধান গ্রাহক এবং তারা তেল ক্রয়ের মাধ্যমে ইরানের সামরিক বাহিনীকে কোটি কোটি ডলার রাজস্ব যোগান দিচ্ছে। তবে চীন সরকার এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই `টিপট` বা স্বতন্ত্র শোধনাগারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো মূলত চীনের মোট শোধন সক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারি বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় এই স্বতন্ত্র শোধনাগারগুলো অনেক সময় অত্যন্ত সস্তায় তেল সংগ্রহ করে থাকে। বিশেষ করে ইরান, রাশিয়া এবং ভেনিজুয়েলার মতো দেশগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এই রিফাইনারিগুলো তাদের কাছ থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান থেকে রপ্তানি হওয়া মোট তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি একাই ক্রয় করেছে চীন। ফলে এই খাতে মার্কিন হস্তক্ষেপ চীনের সামগ্রিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চীনের এই আইনি পাল্টা আক্রমণ আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। চীন তার মোট প্রয়োজনীয় তেলের অর্ধেকেরও বেশি আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের তেল বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করে তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে চাইছে, তখন চীন সেই চেষ্টাকে সরাসরি অগ্রাহ্য করে নিজের বাজার সুরক্ষিত করার পথে হাঁটছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের এই ‘ব্লকিং স্ট্যাটিউট’ বা প্রতিরোধমূলক আইন ব্যবহারের ঘটনাটি ভবিষ্যতে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বে এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করবে। এর ফলে দুই পরাশক্তির মধ্যে জ্বালানি যুদ্ধ আরও দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে
