ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে কি এক বিশাল পরিবর্তনের সুর বাজছে? সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনার প্রাথমিক প্রবণতা অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ১৫ বছর ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস এখন তাদেরই এককালের দুর্গগুলোতে বড় ধরনের ধসের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি প্রথমবারের মতো রাজ্যের ক্ষমতায় বসার অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৮টি আসনের ম্যাজিক ফিগার বিজেপি ইতোমধ্যেই পার করে ফেলেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির তথ্য অনুযায়ী ভোটগণনার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় বিজেপি প্রায় ১৯৭টি আসনে এগিয়ে রয়েছে যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৯৩টি আসনে লিড ধরে রাখতে পেরেছে। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনেও প্রায় একই ধরনের চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানে তৃণমূল ১০২টি আসনে এবং বিজেপি ১৮৩টি আসনে এগিয়ে থাকার খবর জানানো হয়েছে। যদিও ভোট গণনা এখনো চলছে এবং চূড়ান্ত ফলাফল আসতে আরও কিছুটা সময় লাগবে তবুও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই ব্যবধান ঘুচিয়ে তৃণমূলের পক্ষে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা প্রায় অসম্ভব।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল বিতর্কিত স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ৮৯ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল যা ছিল মোট ভোটারের প্রায় ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করেছিলেন এবং এটিকে একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী এই বিপুল সংখ্যক ভোটার বাদ পড়ার বিষয়টি নির্বাচনের ফলাফলে একটি বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে কারণ ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান এই সংখ্যার কাছাকাছিই ছিল।
ব্যক্তিগতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এবারের লড়াই ছিল অত্যন্ত মর্যাদার। ভবানীপুর কেন্দ্রে তিনি তার এককালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বর্তমানে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মুখোমুখি হয়েছেন। গণনার শুরুতে শুভেন্দু অধিকারী কিছুটা এগিয়ে থাকলেও পঞ্চম রাউন্ড শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় ১৬ হাজার ৭০৬ ভোটে এগিয়ে যান। এনডিটিভি জানিয়েছে ভবানীপুরে মমতা নিজের আধিপত্য বজায় রাখলেও রাজ্যের বাকি অংশে তার দলের অবস্থান বেশ নড়বড়ে। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে যেখানে একসময় তৃণমূলের একাধিপত্য ছিল সেখানে এবার বিজেপির গেরুয়া ঝড়ের দাপট দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের নবগঠিত দল। যদিও তারা বড় কোনো আসন পাবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয় তবে কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় তারা ভোট ভাগাভাগিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টের অবস্থাও এবার আশাব্যঞ্জক নয়। তারা কয়েকটি আসনে লড়াই করলেও সামগ্রিক চিত্রে তাদের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। গত নির্বাচনে তারা একটি আসনও না পেলেও এবার মাত্র দুই-একটি আসনে এগিয়ে থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বিজেপির এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি বা দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে তৈরি হওয়া জনরোষকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা দিল্লিতে ইতোমধ্যেই বিজয় উল্লাস শুরু করেছেন। দলের বর্ষীয়ান নেতা রবিশঙ্কর প্রসাদ গণমাধ্যমকে বলেছেন যে এই ফলাফল তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের রায়ের প্রতিফলন। তিনি আরও যোগ করেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে যে আশা জাগিয়েছিলেন তা পরবর্তী সময়ে চরম অরাজকতায় রূপ নিয়েছিল যার উত্তর আজ জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে দিচ্ছে।
নিরাপত্তার খাতিরে ফলতা আসনসহ আরও কয়েকটি কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন যা এই গণনার আওতায় নেই। তবে ২৯৩টি আসনের প্রবণতা স্পষ্টতই বিজেপির দিকে হেলে রয়েছে। সন্ধ্যার মধ্যে অধিকাংশ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল চলে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি এই প্রবণতা বজায় থাকে তবে পশ্চিমবঙ্গ আজ এক নতুন রাজনৈতিক যুগে পদার্পণ করবে যা ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে গেরুয়া শিবিরের অভিষেক নিশ্চিত করবে।
