সোমবার, ০৪ মে, ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়জয়কার, তামিলনাড়ুতে বিজয়ের চমক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৪, ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়জয়কার, তামিলনাড়ুতে বিজয়ের চমক

ভারতের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা করতে যাচ্ছে। সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া ভোটগণনার যে প্রবণতা সামনে আসছে, তাতে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত শক্তির পতন ঘটছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি প্রথমবারের মতো এককভাবে ক্ষমতায় আসার পথ পরিষ্কার করে ফেলেছে। অন্যদিকে দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুতে দাপুটে অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে আসা জোসেফ বিজয়ের দল ‘তামিলনাড়ু ভেট্রি কাজাগাম’ বা টিভিকে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়েছে। সেখানে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা দীর্ঘ ছয় দশকের দ্রাবিড় রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বেশ বেদনাদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনডিটিভির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি প্রায় ২০৫টি আসনে এগিয়ে রয়েছে, যেখানে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস নেমে এসেছে ৯৪টি আসনের ঘরে। এই নির্বাচনের ফলাফলের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে দেখা হচ্ছে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল মোট ভোটারের ১১ শতাংশেরও বেশি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটগণনার আগমুহূর্ত পর্যন্ত একে রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবে দাবি করে আসলেও ফলাফল বলছে জনমতের পাল্লা এবার বিজেপির দিকেই হেলেছে। যদিও মমতা নিজে ভবানীপুর আসনে এগিয়ে রয়েছেন, তবে তার দলের প্রভাবশালী অনেক মন্ত্রীই নিজেদের আসনে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে আছেন।

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এবার যা ঘটেছে, তাকে ভারতের অনেক বিশ্লেষক ‘রাজনৈতিক সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তামিল সুপারস্টার বিজয়ের দল টিভিকে নির্বাচনের ময়দানে নেমেই ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের মতো বড় শক্তিগুলোকে ধসিয়ে দিয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী খোদ মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন তার নিজের দুর্গ হিসেবে পরিচিত কোলাথুর আসনে পরাজিত হয়েছেন। বিজয়ের দল বর্তমানে ১২৮টি আসনে এগিয়ে রয়েছে যেখানে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮টি আসন। এর মাধ্যমে গত ৬০ বছর ধরে চলে আসা দ্রাবিড় রাজনীতির একচ্ছত্র অধিপত্যে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। তরুণেরা এবার প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে একজন নতুন নেতার আহ্বানে সাড়া দিয়েছে যা এই ফলাফলে স্পষ্ট।

পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর পাশাপাশি কেরালা এবং আসাম থেকেও বড় ধরনের পরিবর্তনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কেরালায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট ক্ষমতায় ফিরছে। এর ফলে কেরালায় এলডিএফ শাসনের অবসান হতে যাচ্ছে এবং কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো এর মাধ্যমে পুরো ভারতে বর্তমানে বামপন্থী কোনো সরকার থাকছে না। গত পাঁচ দশকের মধ্যে এই প্রথম ভারতের কোনো রাজ্যে কমিউনিস্ট সরকার নেই— যা বাম রাজনীতির জন্য এক বিশাল বিপর্যয়। কেরালায় বিজেপিও তাদের ভোট শতাংশ বাড়িয়ে অন্তত দুটি আসনে জয়ের রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে আসামে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে বিজেপি তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছে এবং বড় জয়ের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

২০২৬ সালের এই নির্বাচনের ফলাফল ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপিকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলার মতো কঠিন দুর্গে তাদের বিজয় ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে এক বিশাল মানসিক প্রেরণা জোগাবে। বিপরীতে কেরালায় কংগ্রেসের জয় তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিলেও তামিলনাড়ুতে বিজয়ের উত্থান নতুন এক আঞ্চলিক শক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতের জনগণ যে পরিবর্তনের পক্ষে এবং প্রথাগত রাজনীতির বাইরে যাওয়ার সাহস দেখাচ্ছে, এবারের ফলাফল তারই প্রতিফলন। সব মিলিয়ে ভারত এখন এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে যেখানে পুরনো নেতাদের বিদায়ে নতুনদের অভিষেক ঘটছে।

banner
Link copied!