আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়ামে বুধবার অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলের একটি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ নকআউট ম্যাচে বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে এক-শূন্য ব্যবধানে হারিয়ে পরবর্তী রাউন্ডে উন্নীত হয়েছে মার্কিন ফুটবল দল, যা বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। দলের প্রধান কোচ মরিসিও পচেত্তিনোর অধীনে স্বাগতিক দলটি নিজেদের মাটিতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লক্ষ্যে অবিচলভাবে এগিয়ে চলেছে। পচেত্তিনোর অফিসে ঝোলানো একটি অনুপ্রেরণামূলক পোস্টারে লেখা রয়েছে ‘আমরা কেন নই?’, যা এখন পুরো দলের জন্য একটি রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছে। এই টুর্নামেন্টের একুশতম দিনে এসে মার্কিন ফুটবল দল তাদের চার নম্বর ম্যাচটি সফলভাবে সম্পন্ন করল। প্রতিযোগিতার প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে দলের পক্ষে একমাত্র এবং জয়সূচক গোলটি করেন আর্সেনালের সাবেক তরুণ ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন। তবে এই ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দ ম্যাচের দ্বিতীয় অর্ধে বালোগুন সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় রূপ নেয়।
ম্যাচের একষট্টি মিনিটে বসনিয়ার রক্ষণভাগের খেলোয়াড় তারিক মুহারেমোভিচের সাথে বল দখলের এক সাধারণ লড়াইয়ে বালোগুনের বুট অসাবধানতাবশত প্রতিপক্ষের গো্বলিতে আঘাত করে। ব্রাজিলিয়ান রেফারি রাফায়েল ক্লাউস মাঠের লাইভ সিদ্ধান্তে ফাউলটি বুঝতে না পারলেও পরবর্তীতে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর প্রযুক্তির সাহায্যে মাঠের পাশের মনিটরে দীর্ঘক্ষণ স্লো-মোশন রিপ্লে দেখে বালোগুনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। এই আদেশের ফলে আগামী সোমবার রাতে সিয়াটলে অনুষ্ঠিতব্য শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এই ফরোয়ার্ড অংশ নিতে পারবেন না। লাল কার্ড দেখার আগে বালোগুন ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার একাধিক সুযোগ পেয়েছিলেন যার মধ্যে একটি শট বারে লেগে ফিরে আসে এবং আরেকটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়।
ফুটবল ইতিহাসের রেকর্ড বুকে এই ঘটনা বালোগুনকে এক অনন্য ও বিতর্কিত তালিকায় যুক্ত করেছে। তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে একই নকআউট ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি লাল কার্ড দেখার রেকর্ড গড়লেন। এর আগে ১৯৬২ সালের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের গারিঞ্চা, ২০০২ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে রোনালদিনহো এবং ২০০৬ সালের ফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে ফ্রান্সের বিখ্যাত জিনেদিন জিদান এই তেতো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন বা ফিফা কতৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বালোগুনের এই নিষেধাজ্ঞা কেবল এক ম্যাচেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি তা আরও কয়েক ম্যাচ বৃদ্ধি পাবে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, বালোগুনের এই আকস্মিক অনুপস্থিতি আগামী ম্যাচগুলোতে মার্কিন ফুটবল দল-এর সামগ্রিক আক্রমণভাগের রণকৌশলকে কতটা বিপর্যস্ত করে তুলবে।
দলের এই কঠিন পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের পারস্পরিক ঐক্য ও মানসিক শক্তিকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। রাসু্লুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন যে এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য একটি প্রাচীরসদৃশ, যার এক অংশ অপর অংশকে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করে (সহীহ আল-বুখারী, ২৪৪৬)। মার্কিন দলের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় ক্রিস রিচার্ডস ঠিক এই সুরেই সতীর্থের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন যে তারা ছাব্বিশ জনের একটি সুসংহত দল এবং একজন খেলোয়াড় মাঠের বাইরে গেলে অন্যজন তার স্থান পূরণে প্রস্তুত রয়েছে। বালোগুনের অনুপস্থিতিতে আক্রমণভাগের দায়িত্ব এখন বর্তাতে পারে রিকার্ডো পেপির ওপর যিনি দীর্ঘদিন ধরে ফুলহামের নজরে রয়েছেন। ওলন্দাজ ক্লাব পিএসভি-র এই তারকা চলতি টুর্নামেন্টে একশ চুরাশি মিনিট খেললেও এখনো কোনো গোল করতে পারেননি এবং তার শেষ আন্তর্জাতিক গোলটি এসেছিল দুই হাজার চব্বিশ সালের নভেম্বর মাসে।
দলের প্রধান কোচ মরিসিও পচেত্তিনো খেলোয়াড়দের এই লড়াকু মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং ভক্তদের সমর্থনের ওপর আস্থা রাখছেন। ইংল্যান্ডের সাবেক ফরোয়ার্ড সু স্মিথ বিবিসি ওয়ান চ্যানেলে মন্তব্য করেছেন যে এই লাল কার্ডের পর মার্কিন ফুটবল দল অত্যন্ত পেশাদার ফুটবল প্রদর্শন করেছে। প্রতিপক্ষ বসনিয়া শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সর্বাত্মক চেষ্টা করেও মার্কিন রক্ষণব্যূহ ভাঙতে সক্ষম হয়নি। নিজেদের ঘরের মাঠে দর্শকদের অভূতপূর্ব সমর্থনকে পুঁজি করে মার্কিন ফুটবল দল আগামী ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য ফাইনাল ম্যাচ পর্যন্ত নিজেদের স্বপ্নযাত্রা টিকিয়ে রাখতে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী।
