বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই, ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩

জার্মানির ফুটবলে সংকট: পরাজয়ের দায়ভার ও খেলোয়াড়দের বলিদান

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২, ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম

জার্মানির ফুটবলে সংকট: পরাজয়ের দায়ভার ও খেলোয়াড়দের বলিদান

ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে জার্মানির বিদায় নিশ্চিত হয়েছে প্যারাগুয়ের কাছে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। গত আট বছরে এই নিয়ে তিনবার গ্রুপ পর্ব পেরোতে ব্যর্থ হলো চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু এই ব্যর্থতার মূল কারণ অনুসন্ধান না করে এবারও পুরোনো পথে হেঁটেছে জার্মান ফুটবল কর্তৃপক্ষ। পরাজয়ের দায়ভার দলের কৌশল বা কোচিং স্টাফদের ওপর না চাপিয়ে কৌশলে খেলোয়াড়দের দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে, যা জার্মান ফুটবলের সংস্কৃতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ঠিক আট বছর আগে রাশিয়া বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর মেসুত ওজিল এবং ইলকায় গুন্দোয়ানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তুর্কি বংশোদ্ভূত এই দুই খেলোয়াড়কে তৎকালীন জার্মান ফুটবল ফেডারেশন এবং কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো চরম হেনস্তা করেছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর ওজিল আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছিলেন। এবার বিশ্বকাপের চলতি আসরে সেই একই ধারার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।

জার্মান কোচ জুলিয়ান নাগলসম্যান ম্যাচের পর ডেনিজ উন্দাভকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করেছেন। কুর্দি ও ইয়াজিদি বংশোদ্ভূত উন্দাভ এবারের বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে দারুণ পারফর্ম করেছিলেন। তিনি দলের গ্রুপ পর্বের প্রথম দুটি ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। তবুও কোচ নাগলসম্যান তাকে সবার সামনে দোষারোপ করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোচের নিজের কৌশলগত দুর্বলতা ঢাকার জন্যই এমন মন্তব্য করা হয়েছে। জার্মান সমর্থকরা অবশ্য কোচের এই অযৌক্তিক আচরণ মেনে নিতে পারেননি।

জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের বর্তমান কাঠামোর অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ বছর আগে জার্মানি যুব একাডেমিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে বিশ্ব ফুটবলে নতুন আধিপত্য বিস্তার করেছিল। কিন্তু এখন তারা সেই পুরনো গোঁড়ামিতে আটকে আছে। নাগলসম্যানের ট্যাকটিক্যাল ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এবং খেলোয়াড়দের সাথে তার দূরত্ব এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ডেনিজ উন্দাভের মতো খেলোয়াড়দের প্রতি ফেডারেশনের বৈষম্যমূলক আচরণ জার্মানির বর্তমান সংকটের একটি স্পষ্ট নিদর্শন।

উন্দাভ তার পরিশ্রম এবং ত্যাগ দিয়ে নিজের অবস্থানে এসেছেন। তিনি জীবনের শুরুর দিকে কারখানায় কাজ করেছেন এবং নিচের লিগে খেলে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। অথচ জার্মান বুন্দেসলিগার ক্লাবগুলো তাকে মূল্যায়নের প্রয়োজন মনে করেনি। বেলজিয়ামে সাফল্য পাওয়ার পরই তিনি মূলধারার নজরে আসেন। জাতীয় দলের কোচের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মান না পেয়ে এবং দলের পরাজয়ের জন্য বলি হওয়ার আশঙ্কায় উন্দাভ এখন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

জার্মান ফুটবলের এই সংকটের সমাধান কেবল কোচ বদল বা খেলোয়াড় পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফেডারেশনকে তাদের অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। নতুন প্রজন্মের উন্দাভদের যদি ১৭ বছর বয়সে সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে ফুটবলে জার্মানির ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে। আজকের এই পরাজয় কেবল একটি ম্যাচের ফল নয়, এটি জার্মানির দীর্ঘদিনের ফুটবল দর্শনের একটি বড় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। আগামী দিনে তাদের ঘুরে দাঁড়াতে হলে দায়বদ্ধতার এই অস্বস্তিকর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

banner
Link copied!