মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে পাউলিন পাউ হার্নান্দেজ তাঁর সাদা বেতের ছড়িটি গুটিয়ে ব্যাগে ভরলেন। এর ঠিক পরেই তিনি কালো রঙের একটি বিশেষ চোখের মাস্ক বের করে মুখে পরে নেন এবং আলো পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য ফিতাগুলো শক্ত করে বাঁধেন। তাঁর চারপাশে থাকা চিলানগাস এফসি ফুটবল দলের অন্য সদস্যরাও একইভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে শুরু করেন। দলের কিছু সদস্যের আংশিক দৃষ্টিশক্তি থাকলেও অন্যরা সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন, কিন্তু খেলার মাঠে নামার পর সবাই সমান। কারণ সেখানে কারোই দৃষ্টিশক্তি কাজ করে না এবং তাদের সমস্ত গতিবিধি পরিচালিত হয় ধাতব শব্দযুক্ত বিশেষ বলের আওয়াজ ও সতীর্থদের দিকনির্দেশনার মাধ্যমে।
৩১ বছর বয়সী পাউলিন হার্নান্দেজ মেক্সিকো সিটির একজন মা, যিনি সম্প্রতি দলের সঙ্গে মাঠে নেমে অনুশীলন শুরু করেছেন। পাঁচ জনের দলের এই খেলায় বাঁশির শব্দ বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নতুন এক অনুশীলনের প্রস্তুতি। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কোপা আমেরিকা টুর্নামেন্টে অংশ নিতে চলেছে এই নারী দল। এর আগে কখনো মেক্সিকো থেকে কোনো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী ফুটবল দলকে আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতায় পাঠানো হয়নি। ফলে চিলানগাস এফসি দলের এই অংশগ্রহণ ক্রীড়া ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মেক্সিকোতে ফুটবল খেলাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং কোটি কোটি মানুষ এই ক্রীড়ার প্রতি গভীর অনুরাগী। দেশটির ক্রীড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেক্সিকোর বিপুল সংখ্যক মানুষ ফুটবলপ্রেমী এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রে ফুটবলের প্রতি তাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। তবে এই বিপুল জনপ্রিয়তার মধ্যেও নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীদের জন্য ফুটবল খেলার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। দলের কোচ ওয়েন্ডি দেল রিও অতীতে পুরুষদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবল দলের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করার সময় নারী ক্রীড়াবিদদের আগ্রহ লক্ষ্য করেছিলেন। বহু নারী বারবার তাঁর কাছে জানতে চেয়েছেন যে তাঁরা কোথায় ফুটবল খেলতে পারেন।
কোচ ওয়েন্ডি দেল রিও জানান যে একসময় নারীদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দল বা খেলার সুযোগ না থাকায় তাঁরা খুব হতাশ হতেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবল খেলার ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর পুরনো হলেও বিশ্বজুড়ে নারীদের ক্ষেত্রে এই খেলাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। স্পেনে শুরু হওয়া এই খেলাটি পরবর্তীতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়গুলোতে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রীড়া ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর পুরুষরা প্যারালাইপিক্সে অংশ নিলেও নারীদের ফুটবল এখনো প্যারালাইপিক্সে স্থান পায়নি। এর ফলে পর্যাপ্ত তহবিল ও বিশ্বব্যাপী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নারীদের এই খেলার বিকাশ কিছুটা সীমিত রয়েছে।
আসন্ন কোপা আমেরিকা টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে পাউলিন হার্নান্দেজ এবং তাঁর সতীর্থরা কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা আশা করছেন যে তাঁদের এই ঐতিহাসিক অর্জন ভবিষ্যতে আরও অনেক নারীকে খেলাধুলায় অংশ নিতে এবং সামাজিক সব বাধা অতিক্রম করতে উৎসাহিত করবে। সমাজের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী ক্রীড়াবিদদের এই সাহসিকতা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হচ্ছে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই আসন্ন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ কেবল একটি সাধারণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি আত্মবিশ্বাস ও ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মেক্সিকো সিটিতে চিলানগাস এফসি দলের খেলোয়াড়রা যখন তাঁদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন, তখন স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমী ও সাধারণ মানুষ তাঁদের এই ঐতিহাসিক যাত্রার পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে যখন এই অদম্য নারীরা ব্রাজিলের মাঠে খেলতে নামবেন, তখন তাঁদের সঙ্গে থাকবে সমগ্র মেক্সিকোর প্রত্যাশা এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী ক্রীড়াবিদের স্বপ্ন। সামাজিক সব বাধা ও সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সমতা এবং অধিকার আদায়ের এই লড়াই বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
