বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

মহাকাশ প্রযুক্তির রূপান্তর

‍‍`ধার করা প্রযুক্তি টেকসই নয়‍‍` — মহাকাশে আফ্রিকার নজর

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ১০:৫১ পিএম

‍‍`ধার করা প্রযুক্তি টেকসই নয়‍‍` — মহাকাশে আফ্রিকার নজর

বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব মহাকাশ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও যন্ত্রপাতি নির্মাণের দিকে এগোচ্ছে আফ্রিকা। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টের বাণিজ্যিক রাজধানী আবিদজানে সম্প্রতি শেষ হওয়া আফ্রিকা স্পেস এক্সপোতে এই বার্তা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন মহাদেশটির গবেষক ও উদ্ভাবকেরা। নভোচারী পাঠানো কিংবা বিশাল রকেটের প্রদর্শনী করার চেয়ে খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ুর প্রতিকূলতা মোকাবেলা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সমুদ্রপথে নজরদারির মতো বাস্তব সমস্যা সমাধানে উপগ্রহ তথ্য ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য।

সম্মেলনের মূল প্রশ্নটি ছিল আফ্রিকা কেবল প্রযুক্তির ভোক্তা থাকবে নাকি নিজেরাও নির্মাতা হবে।

মহাদেশীয় এই উদ্যোগের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৬১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কোয়ামে নক্রুমার হাত ধরে পারমাণবিক ও মহাকাশ গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায় দেশটি। ষাটের দশকে সামরিক অভ্যুত্থানে মূল পারমাণবিক চুল্লি প্রকল্প বন্ধ হলেও সেই গবেষণা কাঠামো ঘানা স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সহযোগিতায় কুন্তুনসে এলাকায় পরিত্যক্ত একটি ৩২ মিটার অ্যান্টেনা রূপান্তর করে ২০১৭ সালে নিজস্ব রেডিও টেলিস্কোপ হিসেবে চালু করে ঘানা।

পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেলেও প্রযুক্তিগত স্বয়ংসম্পূর্ণতার ক্ষেত্রে এখনও বিস্তর ঘাটতি রয়ে গেছে।

ঘানার মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জোসেফ তান্দো জানিয়েছেন, কৃষি ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর কাজ চলছে। বেলজিয়ামের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় যৌথভাবে কৃষিজমির মাটির আর্দ্রতা ও ফসলের রোগবালাই শনাক্ত করার সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। তবে দেশটির ক্ষুদ্র কৃষকদের বৈচিত্র্যময় চাষাবাদের কারণে বৈশ্বিক স্যাটেলাইট থেকে মাটির আর্দ্রতার সঠিক হিসাব পেতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে ফ্রান্সের সহযোগিতায় নতুন উদ্যোগ এবং নাইজেরিয়ার সাথে যৌথভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের নদীভাঙন রোধে ডিজিটাল নকশা তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে।

এদিকে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিখাতের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও সক্ষমতা বাড়ানোর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। গ্যালাক্সি অ্যারোস্পেস ঘানা নামের একটি স্থানীয় স্টার্টআপ বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে বিশেষ ধরনের বেলুন পাঠিয়ে দেশের ভৌগোলিক মানচিত্র ধারণের পাশাপাশি সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষুদ্র রকেট তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ভিক্টর তাগবোরলোহ ঘানার মধ্য অঞ্চলে প্রায় ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে একটি বিশেষায়িত মহাকাশ বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজস্ব উপগ্রহ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও বিনিয়োগের অভাবে এই পরিকল্পনাগুলো এখনও পুরোপুরি কাঠামোগত রূপ নিতে পারছে না।

গবেষকদের মতে, আফ্রিকার মহাকাশ শিল্পকে শক্তিশালী করতে হলে রাষ্ট্রকেই সরাসরি বিনিয়োগের নেতৃত্ব দিতে হবে। আফ্রিকার উন্নয়ন কাউন্সিলের সভাপতি ব্রাইট আতসু সগবে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ধার করা বা আমদানিকৃত প্রযুক্তি কখনোই কোনো দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর ও নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে নিজস্ব উপগ্রহ সংযোজন ও পরীক্ষার জন্য সরকারি গবেষণাগার তৈরি করেছে। মহাদেশীয় সমন্বয়ের অংশ হিসেবে মিশরের কায়রোতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আফ্রিকান স্পেস এজেন্সি।

শিক্ষা ও শিল্প খাতের সমন্বয় ঘটিয়ে নিজেদের রকেট উৎক্ষেপণ সক্ষমতা অর্জনের তাগিদ দিচ্ছেন স্থানীয় প্রকৌশলীরা। প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও তরুণ প্রজন্মের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারলে মহাকাশ বিজ্ঞানের এই রূপান্তর দ্রুত ঘটবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

banner
Link copied!