অমরত্ব ও আয়ু বাড়ানোর প্রাচীন মানবিক বাসনাকে পুঁজি করে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘায়ু জৈবপ্রযুক্তি খাতে বিপুল আর্থিক বিনিয়োগের নতুন জোয়ার শুরু হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ গবেষণার সমান্তরালে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ধক্য নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত চিকিৎসা উদ্ভাবনে শত শত কোটি ডলার ঢালছেন আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তারা। তবে আণবিক ও কোষীয় জীববিজ্ঞানের মৌলিক জটিলতা অতিক্রম করার আগেই গবেষণাগারের সম্ভাবনাকে ঘিরে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক প্রত্যাশা তৈরি হওয়ায় সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।
বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তার আগেই এই খাতে পুঁজির ব্যাপক প্রবাহ তৈরি হয়েছে।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই দীর্ঘায়ু গবেষণায় যুক্ত জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৩৭৪ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে। বৈশ্বিক আর্থিক সাময়িকীগুলোর বিশ্লেষণে একে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পর আন্তর্জাতিক ধনকুবেরদের সবচেয়ে বড় বাজি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির শীর্ষ পর্যায়েও এই আলোচনা স্থান পেয়েছে। সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসার অগ্রগতি তুলে ধরেন এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বর্তমান শতাব্দীতেই মানুষের আয়ু দেড়শ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
কিন্তু জীবদেহের স্বাভাবিক বার্ধক্য প্রক্রিয়া কোনো নিছক চিকিৎসাযোগ্য শারীরিক ত্রুটি নয়।
গবেষকেরা ইতোমধ্যে বার্ধক্যের জন্য দায়ী বারোটি আন্তঃসংযুক্ত আণবিক প্রক্রিয়া চিহ্নিত করেছেন, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বার্ধক্যের মানদণ্ড বলা হয়। এর মধ্যে জিনগত অস্থিরতা এবং কোষের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ অন্যতম। প্রাণিদেহে নির্দিষ্ট কিছু জিনের পরিবর্তন ঘটিয়ে স্বাস্থ্যরক্ষা ও সাময়িকভাবে আয়ু বৃদ্ধির প্রমাণ মিললেও মানবদেহে এর সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া এখনও পুরোপুরি অজানা। আন্তর্জাতিক ওষুধ প্রশাসনগুলো বার্ধক্যকে সরাসরি কোনো একক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, যার ফলে কোনো নির্দিষ্ট রোগের উপসর্গ ছাড়া সরাসরি বার্ধক্য ঠেকানোর ওষুধ অনুমোদন পাওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
ডিএনএ পুনর্গঠন বা মেরামত প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম হস্তক্ষেপ নতুন শারীরিক জটিলতা ডেকে আনতে পারে।
মানবদেহের নিজস্ব প্রতিরক্ষায় অংশ নেওয়া অ্যান্টিবডি প্রস্তুতকারী বিশেষ বি-কোষগুলো নতুন সংক্রামক জীবাণু শনাক্ত করতে নিজেদের ডিএনএ বিন্যাসে প্রাকৃতিক পরিবর্তন এনে থাকে। গবেষণাগারে ডিএনএ মেরামত প্রক্রিয়াকে অতিমাত্রায় সক্রিয় করলে এসব প্রয়োজনীয় কোষের স্বাভাবিক রূপান্তর ব্যাহত হতে পারে, যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে চরমভাবে দুর্বল করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে। চিকিৎসার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শরীরের একটি অংশ পরিবর্তন করতে গেলে অন্য অংশে অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। যেমন বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে ফেলে এবং কেমোথেরাপির ওষুধ টিউমারের পাশাপাশি দ্রুত বিভাজিত হওয়া সুস্থ কোষগুলোকেও মেরে ফেলে।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে কৃত্রিম উপায়ে আয়ু বাড়ানোর যেকোনো তাড়াহুড়ো মানবদেহের মৌলিক কার্যক্ষমতাকে বিপন্ন করতে পারে। দীর্ঘ কোটি বছর ধরে প্রকৃতি শরীরের রোগ প্রতিরোধ, শারীরিক বৃদ্ধি ও বার্ধক্যের মধ্যে একটি নিখুঁত সামঞ্জস্য তৈরি করেছে, যা অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ভেঙে ফেলা বিপজ্জনক হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
