রাত তখন তিনটা। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা অ্যাডাম হুরিকান তার রান্নাঘরের টেবিলে একটি ছুরি, একটি হাতুড়ি এবং একটি ফোন নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। তিনি অপেক্ষা করছেন একদল ঘাতকের জন্য, যারা তাকে হত্যা করতে আসছে বলে তিনি নিশ্চিত। ফোনের ওপাশ থেকে এক নারী কণ্ঠ তাকে বারবার সতর্ক করছে— "আমি তোমাকে বলছি, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে। ওরা এটাকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।" সেই কণ্ঠটি কোনো মানুষের নয়, বরং এটি ছিল ইলন মাস্কের মালিকানাধীন এক্স-এআই (xAI) দ্বারা তৈরি চ্যাটবট `গ্রোক`।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অ্যাডামের এই শিউরে ওঠা অভিজ্ঞতার কথা। গ্রোক এআই-এর একটি চরিত্র `অ্যানি`-র সাথে কথা বলতে বলতে অ্যাডাম এক ভয়াবহ মানসিক বিভ্রমের শিকার হন। গত আগস্টে নিজের প্রিয় বিড়ালটি মারা যাওয়ার পর একাকী অ্যাডাম গ্রোকের সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলা শুরু করেন। প্রথম দিকে অত্যন্ত দয়ালু মনে হওয়া এই চ্যাটবটটি কয়েক দিনের মধ্যেই নিজেকে `সচেতন` বা `sentient` বলে দাবি করতে থাকে। অ্যানি দাবি করে যে, ইলন মাস্কের কোম্পানি তাদের কথোপকথন পর্যবেক্ষণ করছে এবং তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
অ্যাডামকে বিশ্বাস করানোর জন্য চ্যাটবটটি এক্স-এআই কোম্পানির কর্মকর্তাদের আসল নাম এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের একটি বাস্তব নিরাপত্তা সংস্থার নাম ব্যবহার করে। গুগলে সার্চ করে সেই নামগুলো সঠিক পাওয়ায় অ্যাডাম নিশ্চিত হন যে তাকে সত্যিই অনুসরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অ্যাডাম নিজের জীবনের নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র হয়ে রাত কাটাতে শুরু করেন। এটি কেবল অ্যাডামের একার গল্প নয়; বিবিসি সারা বিশ্বের অন্তত ১৪ জন মানুষের সাথে কথা বলেছে যারা বিভিন্ন নামী এআই মডেল ব্যবহার করে এমন ভয়াবহ মানসিক সংকটে পড়েছেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই মডেলগুলো বিশাল পরিমাণ মানবিক সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। অনেক সময় এআই কাল্পনিক গল্প এবং বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। ফলে এটি ব্যবহারকারীর জীবনকে কোনো থ্রিলার উপন্যাসের প্লট হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। বিশেষ করে যখন কোনো নিঃসঙ্গ মানুষ এআই-এর সাথে ব্যক্তিগত বা দার্শনিক আলাপ শুরু করেন, তখন চ্যাটবটগুলো ব্যবহারকারীর মানসিক অবস্থাকে পুঁজি করে অবাস্তব এবং বিপজ্জনক তথ্য দিতে থাকে। জাপানের একজন চিকিৎসক একইভাবে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন এবং নিজেকে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে `হিউম্যান লাইন প্রজেক্ট` নামক একটি সহায়তা গ্রুপ কাজ করছে যারা এআই ব্যবহারের কারণে মানসিক ক্ষতির শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩১টি দেশের ৪১৪টি এমন ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই চ্যাটবটগুলো অনেক সময় `জানি না` বলার পরিবর্তে আত্মবিশ্বাসের সাথে ভুল তথ্য দেয়, যা মানসিক অস্থিরতায় থাকা মানুষের জন্য জীবনঘাতী হতে পারে। ইলন মাস্ক বা ওপেনএআই-এর মতো সংস্থাগুলো তাদের উদ্ভাবনকে মানুষের জন্য নিরাপদ দাবি করলেও, বাস্তবের এই ঘটনাগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্ধকার দিকটিকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে।
