ইংল্যান্ডের শ্রপশায়ার কাউন্টির একটি ঐতিহ্যবাহী বাজার শহর অসওয়েস্ট্রি। মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় শহরটি পুরোপুরি ইংল্যান্ডের সীমানার ভেতরে। তবে এখানকার জীবনযাত্রা, ভাষা এবং সংস্কৃতির গভীরে তাকালে এক অন্যরকম সত্য বেরিয়ে আসে। এটি এমন একটি ব্রিটিশ শহর যেখানে দোকানের সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে দৈনন্দিন আড্ডায় ইংরেজি নয় বরং ওয়েলস ভাষার প্রাধান্য দেখা যায়। স্থানীয়দের কাছে এটি ইংল্যান্ডের অংশ হলেও এর পরিচয় মূলত ওয়েলস সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিবিসি নিউজের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই অদ্ভুত সীমান্ত শহরটির ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
অসওয়েস্ট্রির একটি জনপ্রিয় ওয়েলস থিমযুক্ত দোকান `সিওপ কুলুম`। এখানকার কর্মী সিয়ান ভন জোনস জানিয়েছেন যে অনেক সময় সারা দিনে তাকে একটিও ইংরেজি শব্দ বলতে হয় না। কারণ এখানকার ক্রেতা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ ওয়েলস ভাষায় কথা বলতে পছন্দ করেন। যদিও এটি ইংল্যান্ডের একটি শহর কিন্তু ভৌগোলিকভাবে এটি ওয়েলস সীমান্ত থেকে মাত্র ৬ মাইল দূরে অবস্থিত। শহরটি ইংল্যান্ডের ভূখণ্ডে একটি ছোট কীলকের মতো ঢুকে আছে যা তিন দিক থেকেই ওয়েলস দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই এখানে দুই দেশের সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিশেল ঘটেছে।
শহরটির ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং রক্তক্ষয়ী। খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দে নির্মিত `ওল্ড অসওয়েস্ট্রি হিল ফোর্ট` এখনো এই অঞ্চলের আদি সেল্টিক গোত্রের সাক্ষ্য বহন করছে। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর অ্যাংলো-স্যাক্সন আক্রমণকারীরা এই অঞ্চল দখল করতে শুরু করলে এখানকার আদি বাসিন্দারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। অষ্টম শতাব্দীতে অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজা অফা একটি বিশাল মাটির বাঁধ বা প্রাচীর নির্মাণ করেন যা `অফা`স ডাইক` নামে পরিচিত। এই প্রাচীরটিই মূলত ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের আধুনিক সীমানা নির্ধারণ করে দেয় এবং অসওয়েস্ট্রি শহরটি সীমানার ঠিক ইংরেজি প্রান্তে পড়ে যায়।
মধ্যযুগে এই শহরটি নিয়ে লড়াই থামেনি। ১২১৬ সালে ইংল্যান্ডের রাজা জন এই শহরটি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন কারণ শহরবাসী ওয়েলসদের পক্ষ নিয়েছিল। আবার ১৪০০ সালে ওয়েলসের জাতীয় বীর ওয়েন গ্লিন্ডাওয়ার একই শহর পুড়িয়ে দেন কারণ তখন তারা ইংরেজদের অনুগত ছিল। এই বারবার হাতবদল এবং সংঘাতের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে অসওয়েস্ট্রির দ্বি-জাতীয় পরিচয়। ঐতিহাসিক মার্ক হিগনেটের মতে এখানকার মানুষ হয় ওয়েলসদের সাথে ব্যবসা করেছে নতুবা তাদের সাথে যুদ্ধ করেছে। এই দীর্ঘ সম্পর্কের কারণেই শহরটি আজ `মিড ওয়েলস` বা মধ্য ওয়েলসের অনানুষ্ঠানিক রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
অসওয়েস্ট্রির এই দ্বৈত পরিচয় আধুনিক জীবনেও স্পষ্ট। এখানকার স্থানীয় ফুটবল দল `দ্য নিউ সেন্টস` বা টিএনএস ইংল্যান্ডের শহর হওয়া সত্ত্বেও ওয়েলসের জাতীয় লিগে খেলে এবং সেখানে সবচেয়ে সফল ক্লাব হিসেবে পরিচিত। এমনকি রাস্তার নামকরণেও এর ছাপ রয়েছে। একদিকে রয়েছে `ইংলিশ ওয়ালস` স্ট্রিট অন্যদিকে `ওয়েলস ওয়ালস` স্ট্রিট। ব্রিটিশ মানচিত্রে শহরটির নাম অসওয়েস্ট্রি হলেও ওয়েলস ভাষায় এর একটি আলাদা নাম রয়েছে যা হলো `ক্রয়েসোওয়াল্ট`। এখানকার মানুষ নিজেদের ব্রিটিশ হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের হৃদয়ে ওয়েলসের প্রতি ভালোবাসা সবসময় অটুট থাকে যা এই শহরটিকে পুরো যুক্তরাজ্যের মধ্যে অনন্য করে তুলেছে।
