সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইসরায়েল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই সামরিক জোট ইসরায়েলের আঞ্চলিক সম্প্রসারণবাদী নীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে পবিত্র মেক্কা নগরীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মেক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এই নতুন সামরিক জোটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ধারাটি হলো তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর যেকোনো ধরনের সশস্ত্র আক্রমণকে তিন দেশের ওপরই যৌথ আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি কাজে লাগিয়ে এই নতুন আঞ্চলিক সমীকরণের পূর্ণাঙ্গ প্রভাব ও কৌশলগত পরিণতি গভীরভাবে মূল্যায়ন করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
তুরস্ককে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অন্যতম প্রধান কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহল। গত মাসে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের পর ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ শীর্ষ নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। গাজা উপত্যকায় চলমান সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে আসছে আঙ্কারা। একই সঙ্গে সিরিয়া এবং লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক হস্তক্ষেপকে তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি বলে অভিহিত করেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। এর জবাবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তানও ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ফিলিস্তিন সংকট এবং লেবাননে ইসরায়েলি হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বিবৃতি দিয়েছিলেন, যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। পাকিস্তান ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় না এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখে চলেছে।
এদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিল ইসরায়েল। মার্কিন প্রশাসনের প্রবল চাপের মুখেও রিয়াদ এই স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব আঞ্চলিক কূটনীতিতে নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে চাইছে। লন্ডনভিত্তিক কিংস কলেজের সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেস ক্রিগ আল জাজিরার সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন যে বর্তমান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সৌদি আরবকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। মার্কিন সামরিক সুরক্ষার ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে রিয়াদ এখন নিজেদের কৌশলগত পরিধি বাড়াতে এবং বিকল্প অংশীদার খুঁজে নিতে সচেষ্ট রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে আব্রাহাম চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে যুক্ত করার জন্য কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে আসছেন। তবে আঞ্চলিক সংঘাত ও সামরিক অস্থিরতার কারণে রিয়াদ তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন কৌশলগত গভীরতা অর্জনের ওপর জোর দিচ্ছে। ফলস্বরূপ, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সৌদি ভূরাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যা আগামী দিনে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।
