লেবাননের নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে দেশটির রাজধানীতে বাশার আল-আসাদ আমলের এক সাবেক সিরীয় সামরিক জেনারেলকে আটক করা হয়েছে। আদেল ইস্সা নামের ওই সাবেক জেনারেল একটি দাপ্তরিক কাজের জন্য বৈরুতে অবস্থিত সিরীয় দূতাবাসে গেলে এই আটকের ঘটনা ঘটে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁকে সিরীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে কি না, সে বিষয়ে বিচারিক পর্যালোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
সংবাদ সংস্থা এএফপি এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে শুক্রবার দূতাবাস পরিদর্শনের সময় দূতাবাসের কর্মীরা বুঝতে পারেন যে দেশের অভ্যন্তরে ওই সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। এরপর দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে লেবাননের সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয়কে বিষয়টি জানানো হয়। খবর পেয়ে লেবাননের কেন্দ্রীয় অপরাধ তদন্ত বিভাগের গোয়েন্দারা দূতাবাসে পৌঁছে তাঁকে হেফাজতে নেন এবং বৈরুতের বিচারপ্রাসাদ এলাকার একটি নিরাপত্তা কেন্দ্রে নিয়ে যান।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আদেল ইস্সা স্বীকার করেছেন যে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর তিনি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে লেবাননে প্রবেশ করেছিলেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত যাবতীয় অভিযোগ তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ার কারণে লেবাননের কর্তৃপক্ষ সিরিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ ফাইল বা অভিযোগপত্র পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী সোমবার এই বিষয়ে পরবর্তী আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে বলে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সাতষট্টি বছর বয়সী আদেল ইস্সা একসময় সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর সতেরোতম ডিভিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে দুই হাজার পনেরো সালে তাঁকে ইরাকি সীমান্তবর্তী দেইর ইজ জোর প্রদেশের গ্রাউন্ড ফোর্সেস বা স্থল বাহিনীর প্রধান হিসেবে বদলি করা হয়। দুই হাজার ষোলো সালের শেষ পর্যন্ত তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল ছিলেন এবং পরবর্তীতে অবসর গ্রহণ করেন। সিরিয়ার যুদ্ধাপরাধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী আসাদ আমলের অবসান ঘটার পর থেকেই এই ধরনের সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, দুই হাজার চব্বিশ সালের ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের হাতে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটে। এরপর থেকেই সাবেক সরকারের অনেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও সামরিক ব্যক্তিত্ব পালিয়ে লেবাননসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নেন। নতুন প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে আসাদ আমলের বিভিন্ন দমনপীড়ন ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতিপূর্বে আসাদের চাচাতো ভাই আতেফ নাজিবসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁদের বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। যদি আদেল ইস্সাকে সিরিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়, তবে আসাদ সরকারের পতনের পর বৈরুতের পক্ষ থেকে এটি হবে কোনো সাবেক কর্মকর্তার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সিরিয়ার বিগত দশকের সংঘাত এবং আসাদ পরিবারের দীর্ঘ শাসনের অবসান একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং তাঁর ভাই মাহের আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাশিয়াতে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের প্রাণহানি এবং লাখ লাখ মানুষের আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে সিরিয়ার সেই গৃহযুদ্ধের অধ্যায় সমাপ্ত হয়েছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এবং নতুন সরকার অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার জন্য কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই বিচার প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানিয়েছে যাতে অতীতে সংঘটিত নৃশংসতার সঠিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। লেবাননের বর্তমান রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত পরিস্থিতিতে এই ধরনের প্রত্যর্পণ এবং আইনি পদক্ষেপ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বৈরুত ও দামেস্কের মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আগামী দিনে অন্যান্য পলাতক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
