রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের চুক্তি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৮, ২০২৬, ১১:০৩ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের চুক্তি

পবিত্র মেক্কা নগরীর আল-সাফা প্রাসাদে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত শুক্রবার সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। আল জাজিরা ও রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে এই চুক্তির ফলে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে তিন দেশের ওপরই যৌথ আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। বর্তমান আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের সূচনা করেছে।

চুক্তির ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো দেশকে সরাসরি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা না হলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এর মূল উদ্দেশ্য হলো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক নিরাপত্তা জোরদার করা। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে নতুন করে হামলা এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর ঘটনা এই চুক্তিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই চুক্তিকে এই অঞ্চলের জন্য শান্তির ঢাল হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান স্পষ্ট করেছেন যে এই জোট কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় আগ্রহী যেকোনো দেশের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিতে তিন দেশ ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত শক্তি নিয়ে একত্রিত হয়েছে। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও আর্থিক সক্ষমতা, পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি ও জনবল এবং তুরস্কের দ্রুত বর্ধনশীল প্রতিরক্ষা শিল্প এই জোটকে শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নীতি কাউন্সিলের গবেষক কামরান বোখারি বলেছেন যে এই মুহূর্তে চুক্তিটির অপারেশনাল বা সামরিক রূপ সীমিত হলেও এটি একটি বড় কৌশলগত বার্তা প্রদান করে। বিশেষ করে ইরানের প্রভাব এবং আঞ্চলিক মিলিশিয়া নেটওয়ার্কের বিপরীতে একটি সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টি এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করলেও সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের পর রিয়াদ নিজেদের কৌশলগত পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। গাজা সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার জেরে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই সম্মিলিত পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির পাশাপাশি বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আগামী দিনে এই জোটের পরিধি কুয়েত বা কাতারের মতো অন্যান্য দেশ পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকরা।

তবে এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা কিছুটা প্রভাবিত হতে পারে কি না, তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে তেহরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে কিছুমাত্রায় কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে এই জোট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ইরানের পক্ষ থেকে এই চুক্তিকে কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ বলে মন্তব্য করা হলেও তেহরান যে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

banner
Link copied!