রাশিয়ার মধ্যভাগের তাতারস্তান প্রজাতন্ত্রের নিকেসকাম শহরে একটি বড় ধরনের ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় অন্তত তেরো জন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় একটি শিশুসহ আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার অভ্যন্তরে এটি অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও প্রাণঘাতী একক হামলার ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইউক্রেনীয় সীমান্ত থেকে প্রায় বারোশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শিল্পাঞ্চলে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং তাতারস্তান সরকার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ভোরে নিকেসকাম শহরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও জনবহুল এলাকায় এই মারাত্মক ড্রোন আক্রমণ চালানো হয়। রয়টার্স এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে যে হামলায় তানেকো তেল শোধনাগার এবং সংশ্লিষ্ট পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প কমপ্লেক্স সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। হামলার ফলে সেখানে প্রচণ্ড অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং দিনের আলোয় আকাশে কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলার সাইরেন বাজতে থাকে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে আবাসিক এলাকাগুলোও এই হামলার আওতায় পড়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তাতারস্তানের প্রধান রুস্তম মিননিখানভ এই প্রাণঘাতী হামলার সত্যতা স্বীকার করে নিহতদের পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। নিকেসকাম শহরের মেয়র রা্দমির বেলায়ায়েভ এই ঘটনাকে সমগ্র অঞ্চলের জন্য এক অপূরণীয় বেদনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ওই রাতে দেশজুড়ে চারশ ছাপ্পান্নটি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে কিয়েভের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে এবং তেল শোধনাগারগুলোর মাধ্যমে আসা সামরিক অর্থায়ন ও রসদ সরবরাহ ব্যাহত করতে এই সুনির্দিষ্ট আক্রমণগুলো চালানো হয়েছে।
ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরিণতি মস্কোর সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার বলেছেন যে ইউক্রেনীয় শহরগুলোর ওপর রাশিয়ার নিয়মিত বিমান হামলার জবাবে এই ধরনের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত। অতীতেও জুনের মাঝামাঝি সময়ে এই একই তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। তবে এবারের হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সংঘাতের তীব্রতা এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে এই হামলার ফলে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিশোধন ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই দুই পক্ষই একে অপরের জ্বালানি স্থাপনা ও সরবরাহ লাইন লক্ষ্য করে আসছে। জাতিসংঘ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর এ ধরনের হামলার নিন্দা জানিয়ে আসছে। তাতারস্তানের এই ভয়াবহ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিস্তারিত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
