ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে বিকাশমান এল নিনো পরিস্থিতির প্রভাবে চলতি বছরের জুলাই মাসে বিশ্বের সমুদ্রের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সর্বকালের সকল রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে যে বিশ্বের মেরু অঞ্চলগুলো বাদে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের মধ্যবর্তী অঞ্চলে সমুদ্রের গড় তাপমাত্রা গত মাসে ২০.৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এসে দাঁড়িয়েছে, যা এর আগে ২০২৩ সালে রেকর্ড করা ২০.৮৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আগের সর্বোচ্চ মাত্রাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাড়িয়ে গেছে।
একই সঙ্গে বিগত জুলাই মাসটি বিশ্বজুড়ে সর্বকালের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুলাই হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক শিল্পায়ন যুগের আনুমানিক গড়ের তুলনায় ১.৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওপরে অবস্থান করছিল। গবেষকদের মতে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সমুদ্রের ভূমিকা অপরিসীম, কারণ এটি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে বায়ুমণ্ডলে সৃষ্ট অতিরিক্ত তাপের একটি বিশাল অংশ মহাসাগরের ভেতরে শোষণ করে নেয় এবং বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের ভারসাম্য বজায় রাখে। সমুদ্রের তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানি প্রসারিত হচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অঞ্চলে উষ্ণ পানির আধিক্যের কারণে দীর্ঘস্থায়ী এবং অত্যন্ত তীব্র সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ তৈরি হচ্ছে। এই অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের ফলে সমুদ্রের প্রবাল প্রাচীরগুলো ব্যাপক মাত্রায় বিবর্ণ ও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য এক ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে। উষ্ণ সমুদ্রের উপরিভাগ বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত তাপ ও আর্দ্রতা সরবরাহ করায় ক্রান্তীয় ঝড় ও সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জনবহুল উপকূলীয় এলাকায় আকস্মিক ভারী বর্ষণ ও বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলে জুন ও জুলাই মাসজুড়ে রেকর্ড ভাঙা তীব্র গরম অনুভূত হয়েছে, যা সমগ্র অঞ্চলটির দীর্ঘমেয়াদী খরার পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। ইউরোপীয় মধ্যম পাল্লার আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ জলবায়ু গবেষক সামান্থা বার্গেস জানিয়েছেন যে পশ্চিম ইউরোপজুড়ে পরপর ৩ মাস ধরে চলা এই ব্যতিক্রমী তাপপ্রবাহ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। বায়ুমণ্ডলে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চচাপ বলয়ের উপস্থিতির কারণে অঞ্চলটিতে তীব্র তাপ আটকে পড়েছিল এবং শুষ্ক মাটির কারণে প্রাকৃতিক শীতলীকরণের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিল।
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন যে এই ধরনের চলমান পরিবেশগত সংকট বিশ্বজুড়ে কৃষিজমি, খাদ্য নিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এবং সামুদ্রিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জনবহুল অঞ্চল নতুন করে তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হওয়ায় বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।
