পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের উপকূলে স্থানীয় সময় শনিবার ভোরে আঘাত হেনেছে অত্যন্ত শক্তিশালী এক ভূমিকম্প। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা এবং ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.৭। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮ জনের প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা। তীব্র ভূকম্পনের ফলে বহু আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা ধসে পড়েছে, যার নিচে বহু মানুষ চাপা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১৫ কিলোমিটার গভীরে। উৎপত্তিস্থল তুলনামূলকভাবে কম গভীরে হওয়ার কারণে এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত বেশি। ফ্লোরেস দ্বীপের সিক্কা, মাউমেরে এবং সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় এর তীব্র প্রভাব অনুভূত হয়েছে। গভীর রাতে বা ভোরের দিকে হঠাৎ এই কম্পন অনুভূত হওয়ায় ঘুমন্ত মানুষ চরম আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। অনেক এলাকায় ভবন ভেঙে পড়ার পাশাপাশি শক্তিশালী আফটারশকের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রধান সুহারিয়ান্তো এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকে জানান যে উদ্ধারকর্মীরা দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বেশ কিছু এলাকায় ভূমিধসের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মাউমেরে বন্দরের কাছে একটি ভবনের অংশবিশেষ ধসে পড়ে ফেরিঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ওপর পড়েছে। পূর্ব নুসা তেনগারা প্রদেশের গভর্নর ইমানুয়েল মেলকিয়াডস লাকা লেনা গণমাধ্যমকে জানান যে ঘুমন্ত অবস্থায় ধসে পড়া দেওয়ালের নিচে চাপা পড়ে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।
ভূমিকম্পের পরপরই উপকূলীয় এলাকায় বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস বা সুনামির আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে সুনামি সতর্কতা জারি করেছিল। উপকূলের বাসিন্দাদের দ্রুত পাহাড়ি বা নিরাপদ উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নিজ উদ্যোগে ও প্রশাসনের সহায়তায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। তবে উপকূলীয় এলাকায় কোনো অস্বাভাবিক বা বিপজ্জনক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় ঘটনার প্রায় তিন ঘণ্টা পর সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে কম্পনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে মানুষ ঘরের ভেতর টিকতে না পেরে বাইরে খোলা আকাশের নিচে বা সড়কের পাশে আশ্রয় নেন। সিক্কা অঞ্চলের তালিবুরা গ্রামের এক বাসিন্দা জানান যে পুরো পরিবারকে নিয়ে তারা আতঙ্কে ঘর থেকে পালিয়ে যান এবং দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় অবস্থান করেন। আরেকটি এলাকার এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বর্ণনা করেছেন যে ভূমিকম্পের সময় মনে হচ্ছিল তারা যেন কোনো ট্রাম্পোলিনের ওপর অবস্থান করছেন।
প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের ফলে ৫৪টির বেশি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপাসনালয়, সরকারি ভবন এবং গুদামঘর ধসে পড়েছে। মাউমেরে ও সংলগ্ন জেলাগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ ও যোগাযোগ রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দলগুলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া পরিচিত। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অব ফায়ার বা অগ্নিনির্বাপক বলয়ের ওপর অবস্থিত হওয়ার কারণে এখানে প্রায়ই বড় ধরনের টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়া ও ভূমিকম্প ঘটে থাকে। ১৯৯২ সালে ফ্লোরেস দ্বীপে অনুরূপ একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির কারণে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সরকার ও দুর্যোগ মোকাবিলা বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
