আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার আফগান নাগরিক এক গভীর ও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। ইউরোপীয় দেশগুলোতে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব এবং উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে কঠোর হচ্ছে আশ্রয় ও সীমান্ত নীতি। ফলস্বরূপ, পূর্বে যাঁদের নিরাপত্তা ও স্থায়ী আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা এখন নিজ নিজ আশ্রয়স্থলে নতুন আইনি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
আল জাজিরা ও বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্ট মাসে কাবুলের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে চলে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক মিশনগুলোতে কর্মরত প্রায় চার হাজার পাঁচশ আফগান কর্মীকে নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ডাচ সরকারের বিশেষ সুরক্ষায় নেদারল্যান্ডসে পৌঁছানো আব্দুল ওয়ালি নামক এক আফগান নাগরিক ও তাঁর পরিবার দেশটির উত্তরাঞ্চলের একটি ছোট্ট শহরে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা, সন্তানদের স্থানীয় বিদ্যালয়ে পাঠানো এবং কারখানায় কাজের মাধ্যমে তারা যখন একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিলেন, তখনই দেশটির অভিবাসন নীতিতে হঠাৎ পরিবর্তন আনা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আশ্রয়বিষয়ক সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লক্ষ আফগান নাগরিক ইউরোপীয় ব্লকে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন। ইউরোপীয় সরকারগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কাবুলের বর্তমান প্রশাসনকে স্বীকৃতি না দিলেও, বাস্তবমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে শুরু করেছে। গত জুন মাসে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে তালেবান সরকারের প্রতিনিধিদের একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের মূল এজেন্ডা ছিল ইউরোপের দেশগুলো থেকে অনথিভুক্ত ও প্রত্যাখ্যাত আফগান শরণার্থীদের জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর রূপরেখা তৈরি করা।
রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে ইউরোপের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি জার্মানি ইতোমধ্যে আফগানিস্তানে বহিষ্কারের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। দেশটিতে সংঘটিত কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিরাপত্তা ও অপরাধের রেকর্ড রয়েছে এমন ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাধারণ অভিবাসীদেরও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলো থেকেও একই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত নথিপত্র থেকে জানা গেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইউরোপীয় দেশগুলোর এই দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র সমালোচনা করে জানিয়েছে যে তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে জোরপূর্বক কাউকে ফেরত পাঠানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং তা ওই ব্যক্তিদের জীবনকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেবে। শরণার্থী অধিকারকর্মীদের মতে, যাঁরা অতীতে আন্তর্জাতিক বাহিনী বা মানবাধিকার সংস্থার পক্ষে কাজ করে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন, পশ্চিমা সরকারগুলোর এই নীতি তাদের সঙ্গে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইউরোপীয় রাজধানীগুলো যখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতি ও কড়া সীমান্ত সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিচ্ছে, তখন হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন এক ঝুলন্ত অবস্থায় এসে ঠেকেছে। আইনি অনিশ্চয়তা এবং নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের ভয় এই মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত এক অমানসিক মানসিক চাপের মধ্যে রাখছে, যা বৈশ্বিক শরণার্থী সুরক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
