ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলা সংঘাত এবং সামরিক বাহিনী উপলব্ধতার সংকটের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ায় আগামী মাসে নির্ধারিত একটি বড় ধরনের যৌথ উভচর অবতরণ মহড়া বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র, সংবাদ সংস্থা এএফপি এবং রয়টার্স জানিয়েছে। দক্ষিণ কোরীয় মারিন কর্পসের মুখপাত্র হান সিউং-জিওন সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানান যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরের সাংইয়ং মহড়ায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর জন্য অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। গত জুন মাসেই মার্কিন মারিন কর্পস আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের এই সীমাবদ্ধতার বিষয়টি দক্ষিণ কোরীয় বাহিনীকে অবহিত করেছিল।
দুই বছর অন্তর অনুষ্ঠিত এই সাংইয়ং মহড়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌসেনারা অংশ নিয়ে থাকেন এবং উভচর অবতরণের বিভিন্ন সামরিক কৌশল ও যৌথ অভিযান পরিচালনা মহড়া চালায়। এতে সাধারণত যুদ্ধজাহাজ, সামরিক বিমান এবং স্থলবাহিনী সম্মিলিতভাবে অংশ নেয়। দুই দেশের সামরিক কর্তৃপক্ষ এই মহড়া স্থগিত বা পুনরায় চালুর বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে মুখপাত্র উল্লেখ করেছেন। তবে এই বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথক আরেকটি যৌথ সামরিক মহড়া ছোট করার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই এই বড় ধরনের বাতিলের ঘোষণাটি এল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট চলতি বছরের বার্ষিক উলচি ফ্রিডম শিল্ড মহড়াটি সংক্ষিপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মূলত মধ্যপ্রাচ্য সংকটের খরচ এবং ইরান যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এই কাটছাঁট করা হয়। ফলে গত শুক্রবার শেষ হওয়া বার্ষিক এই সামরিক মহড়ার মেয়াদ এগারো দিন থেকে কমিয়ে মাত্র পাঁচ দিনে নামিয়ে আনা হয়েছিল।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে দুই দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এবং জোটের সক্ষমতা বজায় রাখতে বিকল্প উপায় নিয়ে আলোচনা চলছে। ওয়াশিংটন ও সিউলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারত্ব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয় নিরাপত্তা বিশ্লেෂকেরা। তবে সাম্প্রতিক এই স্থগিতাদেশের ফলে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে বৈশ্বিক সংঘাতে মার্কিন সামরিক শক্তির অতিরিক্ত ব্যস্ততা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোকে ব্যাহত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনার বৈশ্বিক প্রভাব এখন পূর্ব এশিয়ার প্রতিরক্ষা ও মিত্র দেশগুলোর সম্পর্কের ওপরও পড়তে শুরু করেছে। মার্কিন সামরিক শক্তি ও সম্পদ যখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানি ফ্রন্টে ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীভূত রয়েছে, তখন বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে নির্ধারিত পূর্বনির্ধারিত যৌথ সামরিক মহড়াগুলোও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ওয়াশিংটন ও সিউলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখায় নতুন করে কৌশলগত হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। আগামী দিনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বিশ্লেষকদের তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে।
