পিকঅ্যাক্স পর্বতে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে ওয়াশিংটন খুব শিগগিরই ইরানের এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে, আল জাজিরা এবং রয়টার্স জানিয়েছে। ইরানের নাতানজ সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের নিকটবর্তী এই সুরক্ষিত পাহাড়ি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শুক্রবার এই সতর্কবার্তা দেন তিনি। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইরানের প্রধান তেল রপ্তানিকারক কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের উপকূলে একটি তেলের ট্যাংকারে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কয়েক মাস ধরে চলা সামরিক সংঘাত নতুন এক বিপজ্জনক বাঁকে পৌঁছেছে।
মার্কিন প্রশাসন পিকঅ্যাক্স পর্বত ও সামগ্রিক ইরানি ভূখণ্ডে প্রতিটি গতিবিধি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার দাবি করছে। এর আগে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে এক বেতার সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন যে ইরানিদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে এবং খুব দ্রুত সেখানে আঘাত হানা হবে। বর্তমান হুঁশিয়ারি এমন এক প্রেক্ষাপটে এলো যখন মার্কিন প্রশাসন থেকে সংঘাতের তীব্রতা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বার্তা দেওয়া হচ্ছে। একই দিনে হোয়াইট হাউসে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সংঘাত স্তিমিত হওয়ার আভাস দিলেও রণক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি বোমাবর্ষণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ইরানে এই স্থানটি স্থানীয়ভাবে কুহ এ কোলং গজ লা নামে পরিচিত। রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় দুইশ বিশ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং নাতানজ পারমাণবিক কেন্দ্রের মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্বে ইসফাহান প্রদেশে এই পর্বতের অবস্থান। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে শক্তিশালী বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমা থেকে রক্ষা করতে এই স্থাপনাটি ভূপৃষ্ঠের কয়েকশ মিটার গভীর কঠিন গ্রানাইট পাথরের নিচে খনন করা হয়েছে। এর মূল ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠগুলো অন্তত একশ মিটার গভীরে অবস্থিত বলে আন্তর্জাতিক গবেষকেরা নিশ্চিত করেছেন।
পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ ধারণা করেন যে ঘোষিত স্থাপনাগুলোতে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় এই পর্বতের গভীরে একটি অঘোষিত সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে মহাকাশ চিত্র বিশ্লেষণকারী গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে যে স্থাপনাটি এখনো নির্মাণাধীন এবং এটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বেসামরিক এবং জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্যে পরিচালিত, কোনো অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা তাদের নেই।
নাতানজ কেন্দ্রে অতীতে একাধিক অন্তর্ঘাতমূলক আক্রমণ ও বোমাবর্ষণের পর পাহাড়ি গুহার অভ্যন্তরে উন্নত সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন কক্ষ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তেহরান। পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর মূল অংশ মাটির গভীর স্তরে সুরক্ষিত রাখাই ছিল এই প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রধান কারণ। ষাট দিনের একটি মধ্যস্থতা সময়সীমা কোনো ধরনের সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে।
ইরানের খাতাম আল আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সামরিক সদর দপ্তর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে নাতানজ সংলগ্ন পর্বতে যেকোনো বোমাবর্ষণ গোটা অঞ্চলে সংঘাতকে আরও তীব্র ও অনিয়ন্ত্রিত করে তুলবে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে নাতানজ চত্বরে বর্তমানে কোনো ধরনের অননুমোদিত পারমাণবিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে না। এমন এক সময়ে পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাতের হুমকি আসছে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে মারাত্মক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
উভয় দেশের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের নৌ ও জ্বালানি করিডোরে গভীর সংকট তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন তাদের কৌশলগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই পর্বতের অবকাঠামোকে অকার্যকর করার বার্তা দিলেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো ভূগর্ভস্থ গভীরতার কারণে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাব্য মাত্রা নিয়ে নানা সংশয় প্রকাশ করেছে। এই উত্তেজনার মধ্যেই পারস্য উপসাগরে সামরিক প্রস্তুতি ও বিমান টহল বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েছে উভয় পক্ষ।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা প্রশমনে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ফোরামগুলোতে এখনো কোনো ফলপ্রসূ অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। কূটনৈতিক সমঝোতার অভাব এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান দুই দেশের মধ্যবর্তী সংঘাতকে আরও অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নাতানজ চত্বরের উপগ্রহ চিত্র নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার কথা জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষকেরা।
