বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স জানিয়েছে যে তারা তাদের প্ল্যাটফর্মে রেকর্ড ৬শত্রু কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের সাইবার হামলার শিকার হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত তহবিলের ৯০ শতাংশ ইতোমধ্যে পুনরুদ্ধার ও প্রতিস্থাপন করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি তাদের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে জানিয়েছে যে বাকি ১০ শতাংশ টোকেন তুলনামূলকভাবে কম তরল প্রকৃতির এবং সেগুলোর ক্রয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হবে।
বাইন্যান্সের কো-চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার রিচার্ড টেং গ্রাহকদের শতভাগ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে প্ল্যাটফর্মটির দৃঢ় প্রতিশ্রুতির কথা নিশ্চিত করেছেন।
তিনি স্পষ্ট করে জানান যে প্রতিষ্ঠানটি বাকি অংশের ক্ষতি পূরণেও সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কোনোভাবেই গ্রাহকদের এই আর্থিক ক্ষতির বোঝা বইতে হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআইয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে এই বড় ধরনের সাইবার হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
এফবিআইয়ের ভাষ্যমতে, ট্রেডারট্রেইটর নামক উত্তর কোরিয়ার একটি কুখ্যাত হ্যাকার গোষ্ঠী এই বিশাল আকারের সাইবার হামলা এবং অর্থ চুরির ঘটনাটি সুচারুভাবে পরিচালনা করেছে।
তদন্তকারী সংস্থার বিবৃতিতে আরও বলা হয় যে উত্তর কোরিয়া গত বছরের ২৯ অক্টোবর বা তার কাছাকাছি সময়ে এই এক্সচেঞ্জ থেকে প্রায় ৬শত্রু কোটি ডলার সমমূল্যের ভার্চুয়াল সম্পদ অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছে।
তদন্তকারীরা ইতিমধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে হ্যাকারদের সাথে যুক্ত ডিজিটাল ঠিকানাগুলোর মাধ্যমে যেকোনো ধরনের লেনদেন অবিলম্বে ব্লক করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ট্রেডারট্রেইটর গোষ্ঠীটি মূলত আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও কুখ্যাত লাজারাস গ্রুপের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে জানিয়েছে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
এই লাজারাস গ্রুপটি ২০১৪ সালে সনি পিকচার্সে সাইবার হামলা চালিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছিল, যা ছিল উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং-উনকে নিয়ে নির্মিত একটি ব্যঙ্গাত্মক চলচ্চিত্রের প্রতিবাদ।
বাইন্যান্সের প্রধান রিচার্ড টেং এই সাইবার হামলাকে একটি অত্যন্ত জটিল ও সুপরিকল্পিত অপারেশন হিসেবে বর্ণনা করে জানান যে হ্যাকাররা একটি সংক্রামিত ল্যাপটপ এবং বিশেষ ম্যালওয়্যার ব্যবহার করেছিল।
হামলাকারীরা ডিজিটাল প্রমাণ পুরোপুরি মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে এই ম্যালওয়্যার ব্যবহার করেছিল, যা পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রক্রিয়াকে বেশ দীর্ঘ ও জটিল করে তোলে।
এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে বাইন্যান্স তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৬শত্রু কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ বরাদ্দ করেছে বলে জানিয়েছে।
নিরাপত্তা লঙ্ঘনের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের সুরক্ষার জন্য সংরক্ষিত সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড থেকে ১শত্রু কোটি ডলার ব্যবহারের পাশাপাশি অন্যান্য তহবিল থেকে এই টোকেনগুলো পুনরায় কেনা হয়।
এই নজিরবিহীন সাইবার হামলার ঘটনার পরপরই বিশ্বজুড়ে প্রধান প্রধান ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারগুলোতে বড় ধরনের দরপতন লক্ষ্য করা গেছে।
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিটকয়েনের দাম প্রায় ৫ শতাংশ, ইথারের দাম প্রায় ৬ শতাংশ এবং বাইন্যান্সের নিজস্ব টোকেন বিএনবির দাম প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়।
সাইবার হামলার এই বিশাল আকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তর কোরিয়ার গোপন উপায়ে অবৈধ রাজস্ব অর্জনের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে পূর্ব এশিয়ার এই বিচ্ছিন্ন দেশটি।
