শুক্রবার, ০৮ মে, ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩

ইতিহাস ফিরছে এথেন্সে: মার্বেল ভাস্কর্য নিয়ে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সিদ্ধান্ত

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৮, ২০২৬, ১২:০৮ এএম

ইতিহাস ফিরছে এথেন্সে: মার্বেল ভাস্কর্য নিয়ে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সিদ্ধান্ত

লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে থাকা আড়াই হাজার বছরের পুরনো পার্থেনন মার্বেল ভাস্কর্যগুলো গ্রিসে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা এই সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক বিরোধ মেটাতে উভয় পক্ষই এখন একটি ‍‍`সাংস্কৃতিক অংশীদারিত্বের‍‍` কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে রয়টার্স ও বিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রাচীন গ্রিসের অমূল্য এই প্রত্নসম্পদ পুনরায় এথেন্সের মাটিতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

পার্থেনন মার্বেল যা এলগিন মার্বেল নামেও পরিচিত মূলত এথেন্সের পার্থেনন মন্দিরের অংশ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রিটিশ কূটনীতিক লর্ড এলগিন এই ভাস্কর্যগুলো সরিয়ে লন্ডনে নিয়ে আসেন। সেই থেকে এগুলো ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে আছে। তবে গ্রিস দীর্ঘ দিন ধরেই দাবি করে আসছে যে লর্ড এলগিন অবৈধভাবে এই ভাস্কর্যগুলো চুরি করেছিলেন এবং এগুলো গ্রিসের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সম্প্রতি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের চেয়ারম্যান জর্জ অসবর্ন গ্রিসের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক গোপন বৈঠক করেছেন। এসব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি দীর্ঘমেয়াদী ঋণ চুক্তি যার মাধ্যমে ভাস্কর্যগুলো এথেন্সে ফেরত পাঠানো হতে পারে। বিনিময়ে গ্রিস তাদের মিউজিয়াম থেকে অন্যান্য বিরল ও প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন লন্ডনে প্রদর্শনের জন্য পাঠাবে। ব্রিটিশ মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তারা একটি ইতিবাচক সমাধান খুঁজছে যা উভয় দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।

তবে এই সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে ব্রিটেনে আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক বিতর্ক এখনো রয়ে গেছে। ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী মিউজিয়ামের সংগ্রহ থেকে কোনো বস্তু স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়া বা বিক্রি করা নিষিদ্ধ। এই আইনি বাধা কাটাতে ব্রিটিশ সরকার বা মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ একটি হাইব্রিড মডেল নিয়ে কাজ করছে যেখানে মালিকানা লন্ডনের হাতে থাকলেও ভাস্কর্যগুলো থাকবে এথেন্সে। গ্রিস অবশ্য বারবার বলছে যে তারা কেবল ঋণের ভিত্তিতে নয় বরং পূর্ণাঙ্গ মালিকানা ফিরে পেতে চায়।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই সমঝোতা সফল হলে তা বিশ্বের অন্যান্য মিউজিয়ামের জন্য একটি বড় নজির হয়ে থাকবে। বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন মিউজিয়ামে থাকা ঔপনিবেশিক আমলের লুট করা প্রত্নসম্পদ ফেরত দেওয়ার দাবি আরও জোরালো হবে। ইতিপূর্বে জার্মানি ও ইতালি কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন তাদের উৎপত্তিস্থলে ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। পার্থেনন মার্বেল ফিরে পাওয়া গ্রিকদের জন্য কেবল শিল্পের বিষয় নয় বরং এটি তাদের জাতীয় মর্যাদার লড়াই।

এথেন্সের অ্যাক্রোপলিস মিউজিয়ামে একটি গ্যালারি গত এক দশক ধরে শূন্য রাখা হয়েছে এই আশায় যে একদিন লন্ডনের ভাস্কর্যগুলো সেখানে পুনরায় স্থাপন করা হবে। গ্রিসের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে তারা আলোচনার অগ্রগতিতে খুশি তবে যতক্ষণ না কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে ততক্ষণ তারা সতর্ক অবস্থানে থাকতে চায়। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে যে আলোচনা চলমান এবং তারা আশা করছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান শীঘ্রই বেরিয়ে আসবে।

পার্থেনন মার্বেল নিয়ে এই নতুন গতিশীলতা আন্তর্জাতিক শিল্প জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করছেন ভাস্কর্যগুলো যদি শেষ পর্যন্ত এথেন্সে ফিরে যায় তবে তা হবে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক বিজয়। পর্যটন ও ইতিহাসের নিরিখেও এই পদক্ষেপটি লন্ডনের চেয়ে এথেন্সের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে চূড়ান্ত ঘোষণার দিকে যা হয়তো শীঘ্রই সংবাদ শিরোনাম হতে যাচ্ছে।

banner
Link copied!