২০২৬ সালের মে মাসে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, অন্যদিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, বর্তমান সময়ের তরুণরা (বিশেষ করে জেন-জি এবং জেন-আলফা) এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। প্রযুক্তির চাকা যত দ্রুত ঘুরছে, প্রথাগত কর্মসংস্থান এবং মানসিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি ততই নড়বড়ে হয়ে উঠছে। আজকের এই বিশ্লেষণে আমরা দেখব কেন ২০২৬ সালটি তরুণদের জন্য একই সাথে আশার আলো এবং গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান সময়ে তরুণদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান। আইএলও-র ২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ট্রেন্ডস’ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে তরুণদের বেকারত্বের হার এখন ১২.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই হার আরও ভয়াবহ—প্রায় ২৭.৯ শতাংশ তরুণ শিক্ষা বা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণের (NEET) মধ্যে নেই। তবে কেবল সংখ্যার হিসেবে এই সংকট বোঝা সম্ভব নয়। আসল সংকটটি লুকিয়ে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাবে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের পর থেকে উচ্চ এআই-ঝুঁকিপূর্ণ পেশাগুলোতে ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের নিয়োগ প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। আগে যেসব এন্ট্রি-লেভেল কাজ বা ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে তরুণরা ক্যারিয়ার শুরু করত, সেই কাজগুলো এখন অবলীলায় করে দিচ্ছে এআই চ্যাটবট বা অটোমেশন সিস্টেম। ফলে শিক্ষিত তরুণরা ডিগ্রি হাতে নিয়েও পেশাদার জগতে প্রবেশের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না।
কর্মসংস্থানের এই সংকটের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যের এক নীরব মহামারি। ‘জেড ফাউন্ডেশন’ এবং ‘অরা ২০state of the youth’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসে তরুণদের মানসিক অবস্থা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং বা ডিজিটাল সুস্থতার নিম্নস্তরে রয়েছে। স্মার্টফোনের অত্যধিক ব্যবহার এবং অ্যালগরিদম-চালিত কন্টেন্টের প্রভাবে তরুণদের মধ্যে মনোযোগের অভাব (ADHD) এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে তারা সারা বিশ্বের সাথে সংযুক্ত থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে তীব্র একাকীত্ব অনুভব করছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ (Eco-anxiety) এবং বিশ্বজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের এই মানসিক চাপকে আরও ঘনীভূত করছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চিত্রটি আরও জটিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তরুণরা একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনের পর দেখা যাচ্ছে, অনেক তরুণই রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে। মডার্ন ডিপ্লোম্যাসি’র এক বিশ্লেষণ বলছে, অভ্যুত্থানের দুই বছর পরেও সিস্টেমের কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়ায় এবং বেকারত্ব সমস্যার আশানুরূপ সমাধান না আসায় অনেক জেন-জি ভোটার এখন রাজনৈতিকভাবে নিস্পৃহ হয়ে পড়ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যে উচ্চাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন বাস্তবতার কঠিন পাথরে ধাক্কা খাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং টেকসই কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ২০২৬ সালের তরুণরা কেবল সংকটের শিকার নয়, তারা পরিবর্তনের নায়কও। এআই প্রযুক্তির কারণে কিছু চাকরি হারালেও, এই তরুণরাই আবার নতুন ধারার ‘এআই ইকোনমি’র মূল কারিগর। ফ্রিল্যান্সিং, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন এবং রিমোট ওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে তারা গ্লোবাল মার্কেটে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে। সনাতনী ডিগ্রি অর্জনের চেয়ে তারা এখন ‘স্কিল-বেসড’ লার্নিং বা দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ডিজিটাল স্পেসে সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তারা নতুন আয়ের পথ তৈরি করছে। এছাড়া সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার রক্ষায় এই প্রজন্মের সরব উপস্থিতি পুরো বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের তরুণ প্রজন্মের বর্তমান অবস্থা হলো এক ধরনের ‘স্ট্রাগল ফর এক্সিস্টেন্স’। তারা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছে যেখানে তথ্য অনেক কিন্তু স্থিতিশীলতা কম। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র এবং নীতিনির্ধারকদের কেবল ভাষণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিক্ষা ব্যবস্থাকে দ্রুত এআই-ফ্রেন্ডলি করে তোলা, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহজলভ্য ক্লিনিকাল সাপোর্ট নিশ্চিত করা এবং তরুণদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। নতুবা এই বিশাল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ খুব দ্রুতই জনমিতিক বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
